ট্রাইব্যুনালে বিটিসিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক

ইন্টারনেট বন্ধ করে কনফার্ম করতে বলেন পলক

সেদিন সন্ধ্যা ৭টার পর বিটিআরসি কর্তৃক ‘১৮ই জুলাই আইটিসি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। ওই গ্রুপে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ডিজিএম আবদুল ওয়াহাব এবং বিটিসিএলের প্রতিনিধি হিসেবে আনোয়ার হোসেন মাসুদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাত ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান একটি ভয়েস কলের মাধ্যমে ইন্টারনেট শাটডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন। এ ছাড়া ‘আইআইজি অপারেশনস’ নামে আরেকটি গ্রুপে বিটিআরসির উপপরিচালক মেহেরীন আহসান এসএমএসের মাধ্যমে সবাইকে ইন্টারনেট বন্ধ করে ইংরেজিতে ‘ডান’ লিখে জানানোর নির্দেশনা দেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

সাবমেরিন ক্যাবল পর্যায়ে ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে সরাসরি ফোনে সময় জানতে চেয়েছিলেন তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। তিনি মামলার পাঁচ নাম্বার আসামি হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি।

গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। অপর সদস্য হলেন- বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে বিটিআরসি কর্মকর্তা জানান, তিনি বর্তমানে বিটিসিএলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মরত এবং ইতঃপূর্বে প্রেষণে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানিতে ছিলেন। গত ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদটি শূন্য থাকায় তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এমডির দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেদিন সন্ধ্যা ৭টার পর বিটিআরসি কর্তৃক ‘১৮ই জুলাই আইটিসি অপারেশনস’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। ওই গ্রুপে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ডিজিএম আবদুল ওয়াহাব এবং বিটিসিএলের প্রতিনিধি হিসেবে আনোয়ার হোসেন মাসুদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাত ৭টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান একটি ভয়েস কলের মাধ্যমে ইন্টারনেট শাটডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত জানিয়ে নির্দেশনা প্রদান করেন। এ ছাড়া ‘আইআইজি অপারেশনস’ নামে আরেকটি গ্রুপে বিটিআরসির উপপরিচালক মেহেরীন আহসান এসএমএসের মাধ্যমে সবাইকে ইন্টারনেট বন্ধ করে ইংরেজিতে ‘ডান’ লিখে জানানোর নির্দেশনা দেন।

এই কর্মকর্তা বলেন, সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির প্রধান কার্যক্রম ইন্টারনেট সংযোগ প্রদান হলেও এর আইআইজি লেভেলে গ্রাহক সেবা প্রদানের লাইসেন্স রয়েছে। তিনি শুধু আইআইজি লেভেলে (যার সক্ষমতা ছিল ২০০ জিবিপিএস) ইন্টারনেট বন্ধে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানির মোট গ্রাহক সংযোগ ছিল প্রায় দুই হাজার ৭০০ জিবিপিএস, যা দেশের মোট সংযোগের ৪০ শতাংশ। রাত ৮টার দিকে আবদুল ওয়াহাব তাকে ফোনে জানান যে, বিটিআরসি কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ শাটডাউনের নির্দেশনা দিয়েছে। ইতঃপূর্বে কখনো সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধ না হওয়ায় তিনি বিষয়টি শুনে হতচকিত হন।

রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিটিআরসির ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান সরাসরি তাকে ফোন করে সাবমেরিন লেভেলে ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেন। এরপর রাত ৯টার দিকে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তাকে ফোন করেন এবং বিটিআরসির নির্দেশনা কেন প্রতিপালন করা হচ্ছে না তা জানতে চান। প্রতিমন্ত্রী ইন্টারনেট বন্ধে কত সময় লাগবে জানতে চাইলে তিনি ১৫ মিনিট সময় লাগবে বলে জানান। তখন পলক তাকে ইন্টারনেট বন্ধ করে কনফার্ম করতে বলেন। অতঃপর তিনি জিএম (অপারেশনস)-এর মাধ্যমে কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় সাবমেরিন ক্যাবল দু’টি শাটডাউন করেন।

জবানবন্দীতে তিনি আরো উল্লেখ করেন, ২৩ জুলাই বিটিআরসিতে এক সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী ওই রাতেই ইন্টারনেট চালুর সম্ভাবনা জানালে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে তিনি সাবমেরিন ব্যান্ডউইথ আবার চালু করেন। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট সকাল ১০টায় বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি মোস্তাফিজুর রহমান আবার সাবমেরিন বন্ধের নির্দেশ দিলে বেলা ১১টায় তা বন্ধ করা হয় এবং বেলা ১টা ১৫ মিনিটে পুনরায় চালুর নির্দেশ দিলে তা কার্যকর করা হয়। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে মির্জা কামাল আহমেদ তার মোবাইল নম্বরের (০১৫৫.....১৫) এক মাসের সিডিআর, ফরোয়ার্ডিং রিপোর্ট এবং হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথোপকথনের ১১ পাতার স্ক্রিনশটসহ মোট ২০ পাতার নথি (প্রদর্শনী ১০, ১১ ও ১২ সিরিজ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছেন। সিডিআরের কপিতে টেলিটকের ডিজিএম হাসিব নবী, সিনিয়র ম্যানেজার শাহিদুর রহমান এবং অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক মো: মনছুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে বলে তিনি জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন।

সাক্ষীর জেরা

সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের আইনজীবীর জেরার মুখে বিটিআরসির তৎকালীন একজন উপপরিচালক ১৮ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। মামলার তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে আদালতে দেয়া তার পূর্ববর্তী জবানবন্দীর পরিপ্রেক্ষিতে এই জেরা সম্পন্ন করেন আইনজীবী আমিনুল গনি টিটু। নিরাপত্তার স্বার্থে আদালত এই সাক্ষীর নাম প্রকাশ করেননি।

জেরার জবাবে সাক্ষী জানান, বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন বিভাগে পরিচালক গোলাম রাজ্জাকের অধীনে তিনিসহ মোট পাঁচজন উপপরিচালক কর্মরত ছিলেন। তারা হলেন- ড. শামসুজ্জোহা, মো: আশরাফুল, মাহাদি আহম্মেদ এবং আফজাল রেজা। অফিসের স্বাভাবিক সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা হলেও বিশেষ প্রয়োজনে তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হতো। ১৮ জুলাইয়ের ঘটনার রাতে তিনি বাসায় ছিলেন উল্লেখ করে বলেন, ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় মহাপরিচালক তাকে কল করেছিলেন। তবে মহাপরিচালক টেলিটক নম্বর ব্যবহার করলেও ওই সময় তার সাথে গ্রামীণফোন নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে যোগাযোগ করেছিলেন। বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাফতরিক টেলিটক নম্বরের পাশাপাশি গ্রামীণফোন নম্বরও ব্যবহার করেন বলে তিনি আদালতকে জানান।

জেরার এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এবং বিটিআরসি চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: মহিউদ্দীন আহমেদের মধ্যকার বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাক্ষী বলেন, ওইদিন তাদের মধ্যে কোনো বৈঠক হয়েছিল কি না বা প্রতিমন্ত্রী কোনো নির্দেশনা দিয়েছিলেন কি না- সে সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে ঘটনার দিন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কথোপকথনের স্ক্রিনশট তিনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন। ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ হিসেবে তার মোবাইল ফোনটি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছে।