সংসদে অধ্যাপক মুজিব

ব্যাংক লুটপাটকারীদের ফের চুরির সুযোগ দেয়া হয়েছে

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটকারীদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো তাদের আবারো চুরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ও জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। একই সাথে তিনি প্রস্তাবিত বাজেটে সুশাসন ও জাকাত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, সম্পূরক বাজেট পাসের বিতর্কিত প্রক্রিয়া এবং সরকারি খাতের লাগামহীন অপচয়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

বক্তব্যের শুরুতেই ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে এক সময় ২০ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল। এস আলম ও তার সিন্ডিকেটের লোকেরা সেই টাকা জালিয়াতি করে লুটে নিয়েছে। আমরা চোরদের ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিলাম; কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ওই চোরদের আবারো ব্যাংকে ফিরিয়ে এনে নতুন করে চুরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।’ এ সময় সরকারি দলের প্রথম সারির নেতাদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি দাবি করেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে অনেকের পরিবারের সদস্যরাই এই ব্যাংক লুটপাটের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর ‘জাকাত’ প্রসঙ্গ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সমালোচনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে দারিদ্র্যবিমোচনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো জাকাত ব্যবস্থা। অথচ অর্থমন্ত্রী তার দীর্ঘ বক্তৃতায় একবারের জন্যও জাকাতের কথা উল্লেখ করেননি। দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সঠিক উপায়ে জাকাত ব্যবস্থা চালু ও ব্যবস্থাপনা করলে মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব সহজেই দূর করা সম্ভব হতো। সুদের প্রসারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুদকে স্পষ্ট হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল করেছেন; অথচ বাজেটে সুদ ও ব্যবসাকে একাকার করে ফেলা হয়েছে এবং সুদমুক্ত অর্থনীতি বাস্তবায়নের কোনো রূপরেখা নেই।

সংসদে সম্পূরক বাজেট পাসের প্রচলিত প্রক্রিয়াকে অবৈজ্ঞানিক ও ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আগে জনগণের টাকা যথেচ্ছ খরচ ও দুর্নীতি করে ফেলা হয়, আর পরে এসে সংসদে তার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাওয়া হয়। কাজ তো আগেই শেষ, দুর্নীতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, এখন সংসদে হ্যাঁ-না ভোট দিয়ে আর কী করার আছে!’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি ও অপচয় রোধের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলেননি।

সরকারি পর্যায়ে সম্পদের অপচয়ের বাস্তব উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এই সংসদ ভবনেরই একেকটি কক্ষে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ১৮ থেকে ৩৬টি পর্যন্ত বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়, যেখানে মাত্র এক-দু’টি বাতি জ্বালিয়েই কাজ চালানো সম্ভব। পবিত্র কুরআনে পরিষ্কার বলা আছে, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’। আমরা যদি এভাবে রাষ্ট্রীয় অপচয় না ঠেকাই, তবে আমরা সবাই শয়তানের ভাইয়ে পরিণত হবো।’ মদ ও সিগারেটের দামসংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজারে দেয়া এক বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ কেউ এমনভাবে কথা বলছেন যেন মদ ও সিগারেট আমাদের নিজেদের জিনিস, অথচ সংসদে ওই পাশেই এগুলোকে লালন-পালন করার লোকের সংখ্যাই বেশি।

তিনি নতুন সংসদ সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান। অধ্যাপক মুজিব উল্লেখ করেন, অনেকেই সমসাময়িক সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি না জানায় স্পিকারের আসনে যিনিই বসছেন, তাকে ‘ডেপুটি স্পিকার’ বলে ভুল সম্বোধন করছেন; অথচ আসনটির সাংবিধানিক মর্যাদা অনুযায়ী তাকে ‘স্পিকার’ হিসেবেই সম্বোধন করা উচিত।