বিশেষ সংবাদদাতা
বাজেটের যে বরাদ্দ ও আকার, সবকিছু মিলিয়ে কৃষক থেকে সব শ্রেণিপেশার মানুষের সন্তুষ্টির জন্য কিছু না কিছু দেয়া হয়েছে। সবাইকে খুশি করা হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভর করছে এটার বাস্তবায়ন। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা এটা উচ্চাভিলাষী। বাজেটের যে বরাদ্দ ও আকার, সবকিছু মিলিয়ে এখানে কৃষক থেকে সব শ্রেণিপেশার মানুষের সন্তুষ্টির জন্য কিছু না কিছু দেয়া হয়েছে। বরাদ্দের দিক থেকে আমার মনে হয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যারা আছেন তাদের থেকে খুব একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া করা ঠিক হবে না।
বাজেটে বরাদ্দ বাস্তবায়নে দুটো বড় বাধা দেখা যায়। একটা হচ্ছে অর্থায়নের বাধা অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা এটা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন বিজনেস এজ ইউজুয়াল সিনারিওতে করা সম্ভব নয়। তার জন্য যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে, বেশ কিছু সংস্কার, বেশ কিছু শক্ত পদক্ষেপ। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো না নিলে এই ধরনের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
অতীতের মতো এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারকে হয়তো ঋণের ওপরে বেশি নির্ভর করতে হবে। সে ক্ষেত্রে তার একটা বিরূপ প্রভাব বেসরকারি খাতে পড়বে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়াটা বাস্তবসম্মত হবে না। কারণ এতে ঋণের বোঝাও বাড়তে থাকবে। যেটা এখন দ্রুত গতিতে বাড়ছে। সেটা কিন্তু কোনোরকম টেকসই সমাধান হবে না। তাহলে সমাধানের উপায় হচ্ছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করার জন্য সত্যিকার অর্থে জোর দেয়া দরকার।
দুই নম্বর হচ্ছে বিভিন্ন বাজেটের যে আকারে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে এই অর্থগুলো যদি গুণগত মান রক্ষা না করে আমরা ব্যয় করি, তাহলে এটা তার কাক্সিক্ষত সুফল দেবে না। অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সেটা উন্নয়ন প্রকল্পেই হোক বা সরকারি ব্যয়ই হোক অপচয়, দুর্নীতি, অর্থের লুটপাট যদি দূর না করা যায় তাহলে অধিক অর্থ বরাদ্দ দিয়ে তার কাক্সিক্ষত সুফল অর্জন করা কখনই সম্ভব হবে না। এই দিকে বেশি দৃষ্টি দিতে হবে।
আর শুধু অর্থ বরাদ্দ বেশি দিলেই সমস্যার সমাধানটা হবে না। সমস্যার সমাধানের জন্য যেটা দরকার সেটা অর্থ ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি করা। ভ্যালু ফর মানি এটা এনসিওর করা। আর রাজস্ব আদায় যদি বৃদ্ধি না করতে পারি তাহলে এটা কাক্সিক্ষত সুফলটা আর নিতে সক্ষম হবে না। কারণ তখন এই ঋণের বোঝা আরো বাড়তে থাকবে। সে ক্ষেত্রে ঋণের খাদে পড়ার একটা আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।
জিডিপির যে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটার জন্য সার্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার। বিশেষ করে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ যদি সৃষ্টি করা না যায় এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যগুলো যদি এগিয়ে না নেয়া যায়, বিশেষ করে বেসরকারি খাতকে যদি সচল না করা যায় তাহলে কিন্তু এই যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জন করা দুষ্কর হবে।
ভূঅর্থনৈতিক অবস্থা, জ্বালানি সঙ্কট সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান যে বিরূপ পরিস্থিতিতে আছে অর্থনীতি এবং সমাজ : এই ক্ষেত্রে যদি কোনো গুণগত পরিবর্তন না করা হয় তাহলে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা বা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বা মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কোনোটাই অর্জন করা সম্ভব হবে না।
মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও হবে কষ্টসাধ্য। এখন তো মূলস্ফীতি বাড়ছে। গত মাসেও বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে বৃদ্ধির প্রবণতা এটা নিম্নমুখী হবে তেমন আশা করাটা ঠিক হবে না। অন্তত এই বর্তমান অর্থবর্ষের প্রথম ছয় মাসে। এখন ২০২৭ সালের পরে হয়তোবা যদি সঠিক নীতিগুলো গৃহীত হয় তখন হয়তো মূল্যস্ফীতিটা কমার একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে।
অর্থায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে হয়তো ব্যাংক ঋণের ওপরে ডিপেন্ডেন্সি কমানোর জন্য অর্থায়নের বিভিন্ন হাতিয়ারগুলো আছে যেমন সুকুপ বন্ড মিউজিয়াল বন্ড ইত্যাদি ছাড়তে হবে। সরকারকে ওইসব দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি না পায়। তাহলে বেসরকারি খাত কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এডিপির বাস্তবায়নে সক্ষমতা এখন বড় ফ্যাক্টর। তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। যে প্রকল্পগুলো আছে সেগুলো পরিবীক্ষণ করা উচিত। এর মধ্যে অপচয়মূলক কোনো কম্পোনেন্ট আছে কি না দেখতে হবে। যেগুলো অপ্রয়োজনীয় কম্পোনেন্ট, যেগুলো কেটে ফেলা যায় সেইগুলো বাদ দেয়া উচিত; যাতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার গুণগত মান সুরক্ষা করা সম্ভব হয়। অতীতে যেটা হয় নাই।
বাজেটে ঘাটতি যেটা ধরা হয়েছে অর্থাৎ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা এটা কতটা সম্ভব হবে তা নির্ভর করবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ওপর। যদি তা অর্জিত না হয় তাহলে যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটা নিতে সরকার কতটা আগ্রহী হবেন সেটি বড় প্রশ্ন। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত যদি না হয় তাহলে ব্যয় কমাতে হবে, খরচ কাটছাঁট করতে হবে। আর না হলে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে।



