নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার সেমিকন্ডাক্টরকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশে এরইমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং, এইসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে। তবে এই খাতের উন্নয়নে খুব সম্ভব কোনো একক মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন। গতকাল শনিবার জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
তেজগাঁওয়ে নভোথিয়েটারে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেক, ইলেকট্রনিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস (বিইএআর) সম্মেলন-২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। দুইদিনের এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ও সিলিকন রিভার যৌথ উদ্যোগে এই সম্মেলনে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উন্নয়ন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি নেতৃত্ব, প্রযুক্তির সমন্বয়, উচ্চ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সম্পৃক্ততা এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা বিষয়ক ১১টি অধিবেশন এবং সাতটি কৌশলগত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রমের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমাবদ্ধতা, এবং নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষি পোশাক শিল্প প্রবাসী আয় এবং ডিজিটাল সেবায় সফলতা দেখিয়েছে। মেধাবী তারুণ্য দক্ষ এবং উদ্যমী জনশক্তির উদ্ভাবন শক্তির উপরে ভর করে পোশাক শিল্পের পরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনার অর্থনৈতিক মূল গন্তব্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত পেশাজীবী এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে বলেন, এই সামিট থেকে নতুন নতুন অংশীদারিত্ব গবেষণা উদ্যোগ, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উদ্ভাবনী চিন্তার জন্ম হবে ইনশাআল্লাহ। যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই সামিটে যারা উপস্থিত রয়েছেন, আপনারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান, যেই বাংলাদেশ হবে... স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশের সম্ভাবনার বার্তাটি পেঁৗঁছে দিতে চাই। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্সস এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মিলেমিশে চতুর্থ এবং পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেছে। কমবেশি হয়তো আমাদের একটু ধারণা আছে বিশেষ করে আমরা যারা এই ফিল্ডে কাজ করি না আমাদের সামগ্রিকভাবে একটি ধারণা আছে যে, বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টরটা শুধু একটি শিল্পই নয়, এটি একটা সম্ভবত আধুনিক সভ্যতার একটা ভিত্তি। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডাটা সেন্টার কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কলকারখানা কিংবা মহাকাশের স্যাটেলাইট- প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য।
সেমিকান্ডাক্টর বাজারে বাংলাদেশকে যেতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের দিকে বিশ্বে গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর বাজার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে... এ রকমই যারা সংশ্লিষ্টরা তারা এমনটিই ধারণা করেছিলেন।
বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প তৈরির সব কাঁচামালের ওপর সবধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রফতানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। একইসাথে নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্টার্টআপ অনুদান বিতরণ করা হয়েছে।
বায়োটেক পার্ক নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কর সুবিধা এবং বন্ডেজ সুবিধা প্রদান এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে কাজ করার জন্য। বিদ্যমান যেসব হাইটেক পার্ক আছে এ সবকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি একটি বায়োটেক পার্ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা আমরা করছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত আপনারাও সম্প্রতি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকায় রোডশো আয়োজন করেছেন। বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন, এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সামনে নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আছে। দক্ষতার ঘাটতি আছে, ক্ষেত্রবিশেষ ল্যাবের সীমাবদ্ধতা আছেই। বিনিয়োগেরও হয়তো সীমাবদ্ধতা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতাও রয়েছে। তবে সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেও কিন্তু আমাদের রয়েছে। তবে আমি এই অনুষ্ঠানে এতোটুকু আমি বলতে চাই আমার সরকারের অবস্থান থেকে, আপনাদের সেই অদম্য ইচ্ছাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পেঁৗঁছে দেয়ার জন্য সাধ্য এবং সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে ইনশাল্লাহ বর্তমান সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে এবং থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, যুক্তরাষ্ট্রের পারডু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোহাম্মদ মুস্তফা হোসেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো: আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ জাব্বার বক্তব্য রাখেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে প্রধানমন্ত্রী ‘বিইএআর ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর উদ্বোধন করেন। তিনি বিভিন্ন স্টলে ঘুরে ঘুরে দেখে এবং স্টলে শিক্ষার্থী-গবেষক-স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং বুদ্ধিমান প্রযুক্তি ব্যবস্থাসহ ডিপটেক খাতের উদ্ভাবনসমূহের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হন।
নৌবাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী নবনিযুক্ত প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিজবাহ উল আজীম। গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়।
গত বৃহস্পতিবার নবনিযুক্ত নৌবাহিনী বাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিজবাহ উল আজীমকে ‘ভাইস অ্যাডমিরাল’ র্যাঙ্ক ব্যাজ পরানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌবাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেছেন এবং নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানের সফলতা কামনা করেছেন। নৌবাহিনী প্রধান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
রংপুর অঞ্চলের নেতাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী রাখতে ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে রংপুর বিভাগের মাঠ নেতাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বিকেলে গুলশানে চেয়ারম্যান কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, এটা একটি ধারাবাহিক বৈঠক। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী রাখতেই এই মতবিনিময় সভা করছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিচ্ছেন। রংপুর মহানগর, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলার নেতারা এই বৈঠকে অংশ নেন।
এ ছাড়া বৈঠকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুদু, সহ সাংগঠনিক সস্পাদক আবদুল খালেক উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ২০ জুলাই দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় জেলার তৃণমূল নেতাদের সাথে অনুরুপ বৈঠক করেছিলেন তারেক রহমান।
জানা গেছে, বৈঠকে তৃণমূলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে করণীয় নির্ধারণে বিএনপি চেয়ারম্যান সবার মতামত গ্রহণ করেছেন এবং দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি দলের যে কোনো সিদ্ধান্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।



