নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুদ্ধবিরতির আলোচনার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও উত্তেজনা থামছে না। ওয়াশিংটনের দেয়া সর্বশেষ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে তেহরান। তবে এই কূটনৈতিক তৎপরতার আড়ালে হরমুজ প্রণালী, গাজা ও লেবানন ঘিরে সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। এক দিকে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে গাজায় ত্রাণ বহরের কর্মীদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর অবমাননাকর আচরণের কারণে বিশ্বজুড়ে ােভের আগুন জ্বলছে।
যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি কাঠামোর জবাব পর্যালোচনা করছে ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কয়েক দফা বার্তা আদান-প্রদানের পর ওয়াশিংটনের সর্বশেষ প্রস্তাব নিয়ে তেহরানে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মতামত পেয়েছি এবং তা মূল্যায়ন করে দেখছি।’
এই কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বেগবান করতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নকভি তেহরান সফর করছেন। দুই দেশের মধ্যকার মতপার্থক্য কমিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকের খসড়া তৈরি করতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
ট্রাম্পের আলটিমেটাম : ‘হয় চুক্তি, না হয় হামলা’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপিক ফিউরি’ সামরিক অভিযান স্থগিত করার ছয় সপ্তাহ পার হলেও আলোচনায় খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। উল্টো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমরা যদি সঠিক জবাব না পাই, খুব দ্রুতই হামলা শুরু হয়ে যাবে। আমরা প্রস্তুত।’
কতদিন অপো করবেন- এমন প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, ‘কয়েক দিন হতে পারে, তবে সবকিছু খুব দ্রুত ঘটবে। ইরান নিয়ে আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছি। একটি চুক্তি হবে অথবা এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা বেশ অনাকাঙ্কিত ও নোংরা হবে।’ এই সঙ্কটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন ট্রাম্প।
ইরানের কঠোর অবস্থান ও আইআরজিসির হুঁশিয়ারি
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি করা হয়, তবে প্রতিশ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধটি এবার এই অঞ্চলের বাইরেও বিস্তৃত হবে। আমাদের বিধ্বংসী আঘাত এমন সব স্থানে ছড়াবে যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ইরান আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বলপ্রয়োগ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা একটি অলীক কল্পনা।’ অন্য দিকে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি এক কঠোর নির্দেশনায় জানিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই বিদেশে পাঠানো যাবে না। রয়টার্সের তথ্যমতে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে অন্তত এক ডজন পারমাণবিক বোমা তৈরি সম্ভব। এই ইউরেনিয়াম দেশেই রাখার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তি প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কৌশলগত চাপ ও তেলের বাজার
যুদ্ধবিরতি আলোচনা চললেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ ধরে রাখতে হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে তেহরান। আইআরজিসি জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের কড়া নজরদারির মধ্য দিয়ে ৩১টি তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে বিপুল পরিমাণ ‘ট্রানজিট ফি’ আদায় করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে বলেছেন, জুলাই-আগস্ট নাগাদ বৈশ্বিক তেলের বাজার ‘রেড জোনে’ প্রবেশ করতে পারে। সংকট মোকাবেলায় আইইএ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত মজুদ থেকে ইতোমধ্যে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি বর্বরতা অব্যাহত
এ দিকে আন্তর্জাতিক মহলে ােভের মুখে পড়েছে ইসরাইল। দেশটির কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজামুখী ‘গ্লোবাল সুমুদ ফোটিলা’র আটক মানবাধিকার কর্মীদের চোখ ও হাত বেঁধে মাটিতে বসিয়ে রাখার একটি অপমানজনক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এর ফলে ইউরোপজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড ও কানাডাসহ একাধিক দেশ ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ইতালির প থেকে বেন-গভিরের ওপর ইইউ-এর নিষেধাজ্ঞা দাবি করা হয়েছে।
কূটনৈতিক এই টানাপড়েনের মধ্যেও গাজা ও দণি লেবাননে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৭৫ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ। অন্য দিকে দণি লেবাননে মার্চ থেকে আবার শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি লেবানিজ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে রাশিয়া জানিয়েছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থকে সম্মান জানিয়ে কেবল কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। তবে ওয়াশিংটন-তেহরান চরম অবিশ্বাস এবং ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সম্ভাবনা এখনো সুদূরপরাহত।



