৩ লাখ কোটি টাকার নতুন এডিপির অনুমোদন

ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হতে বড় উন্নয়ন বাজেট : অর্থমন্ত্রী

পরিবহন-যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মোট এডিপির মধ্যে সরকারি অর্থায়ন হবে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ও অনুদান এক লাখ ১০ কোটি টাকা। এডিপিতে মোট থোক বরাদ্দ রয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

পরিবহন-যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সর্Ÿোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দেয়া হয়েছে। মোট এডিপির মধ্যে সরকারি অর্থায়ন হবে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ও অনুদান এক লাখ ১০ কোটি টাকা। এডিপিতে মোট থোক বরাদ্দ রয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশন মিলনায়তনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়। সভা শেষে এডিপি অনুমোদনের তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের জুনে যে জাতীয় বাজেট দিয়েছিল, তাতে দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়েছিল। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় দুই লাখ কোটি টাকায়।

অনুমোদিত এডিপিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এ খাতে এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৮টি। মোট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ১৬.৭০ শতাংশ।

বরাদ্দের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিক্ষা খাত। এবারকার এডিপিতে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। যা মোট এডিপির ১৬ শতাংশ। শিক্ষা খাতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা ১০৭টি।

এডিপি বরাদ্দের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য খাত। এডিপিতে এই খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ১২ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। এটা মোট এডিপির ১১ শতাংশ।

এডিপি তৈরি হয়েছে ৫ স্তম্ভে

রাষ্ট্রসংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সামাজিক সংহতিকে ভিত্তি করে পাঁচ স্তম্ভের উন্নয়ন কৌশলে সাজানো হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি। প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও টেকসই উন্নয়ন যাত্রার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই হবে নতুন এডিপির মূল লক্ষ্য।

আগামী পাঁচ বছরের জন্য কৌশলগত আর্থিক পরিকল্পনার কাঠামোতেও নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) অধীনে একটি উপদেষ্টা কমিটি এই কাঠামো প্রস্তুত করছে।

জানা গেছে, নতুন এডিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি ও আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চলমান অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয়ের বাস্তবায়ন হার বৃদ্ধি পাওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সরকার। একই সাথে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব এমন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পে নতুন ব্যয় সীমিত রাখার সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে, যাতে উন্নয়ন ব্যয় আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়। সরকারের ঘোষিত ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টর আলোকে পুরো এডিপিকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার : এডিপিতে বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। একই সাথে মাল্টি-ইয়ার পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।

বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন : শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন : এতে উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলাকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি : নতুন এডিপিতে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, সংস্কৃতির বিকাশ, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় উন্নয়ন বাজেট নেয়া হয়েছে : অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, উন্নয়নের জন্য উচ্চাকাক্সক্ষা প্রয়োজন। বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সম্ভব নয়। তাই বড় উন্নয়ন বাজেট নেয়া হয়েছে এবং সরকারের বিশ্বাস আছে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি আরো বলেন, ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।’ এনইসির সভা শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

বড় আকারের এডিপি নেয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, টিউবওয়েলের পানি কমে গেলে যেমন পানি ঢেলে চাপ বাড়াতে হয়, তেমনি ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়।

প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগে নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে এবং সেই মানদণ্ড পূরণ করলেই কেবল নিয়োগ দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হলে দায় নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে, যেখানে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

অর্থমন্ত্রী আরো জানান, বর্তমানে সরকারের হাতে থাকা প্রায় এক হাজার ৩০০ প্রকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেসব প্রকল্প অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর বা দুর্নীতিপ্রসূত, সেগুলো বাতিল করা হবে। যেসব প্রকল্প আংশিক সম্পন্ন হয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নতুন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে এবং সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে না।

এডিপিতে সামাজিক খাতে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে যেসব পুরনো প্রকল্প বাদ দেয়া হবে, সেগুলোর জায়গায় নতুন প্রকল্প নেয়ার জন্য থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্বীকার করেন যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কম। তবে এনবিআরের সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করে রাজস্ব বাড়ানো হবে এবং এর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে।’ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো হবে।’ তিনি জানান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে নতুন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ও অ্যাক্রেডিটেশন নিশ্চিত করা হবে।

বাজেটে রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়বে : আসছে বাজেটে রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়ানো হচ্ছে জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, যে জায়গাগুলো রাজস্ব আদায়ের বাইরে ছিল সেগুলোকে আমরা এবার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। আমরা সেটাই করছি।

রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের রাজস্ব আদায়ের হার বিশ্বে একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে। আমরা তো এটিকে সেই জায়গায় রাখতে পারব না। একটা দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে অর্থায়ন প্রয়োজন সেটি আমাদের অবশ্যই বাড়াতে হবে। এজন্য আমরা এনবিআরের একটি রিফর্ম প্রোগ্রামে যাচ্ছি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের নেটওয়ার্ক সেটা বড় করতে যাচ্ছি। তিনি বলেন, বহু দিন নেটওয়ার্কের কথা শোনা গিয়েছে, কিন্তু নেটওয়ার্ক তো বড় হয়নি। ঘুরে ফিরে যারা আছে তারাই ট্যাক্স দিচ্ছে। তাদের ওপর বারবার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এজন্য আমাদের নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। অনেকে হয়তো ন্যূনতম ইনকাম ট্যাক্স দিয়েও নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে। এ বিষয়ে আমরা সবাইকে এনকারেজ করছি।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যত বেশি লোককে আমরা নেটওয়ার্কে আনতে পারব সেটা তাদের জন্যও সুবিধা। কারণ, রাজস্ব আদায় যত বেশি হবে এটার বেনিফিট জনগণের কাছেই যাবে। এটি তো একটি নির্বাচিত সরকার। আগে বেনিফিট গিয়েছে কিছু লোকের পকেটে, এখন বেনিফিট যাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। সুতরাং এখানে একটি ইনসেনটিভ থাকবে। আর রাজস্ব আদায়ের জন্য যে জায়গাগুলো বাইরে ছিল সেগুলোকে আমরা এবার আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছি।