নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বন্দরের সর্ববৃহৎ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার একই দিনে এনসিটি বিষয়ে নৌ-মন্ত্রণালয়ের পৃথক দু’টি চিঠির ভিন্ন বার্তা এমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কি আছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে?
গত বৃহস্পতিবার সকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়- ‘অপারেশন অ্যান্ড মেনটেনেন্স অব সিপিএ’স নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইনক্লুডিং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) বাই প্রাইভেট টার্মিনাল অপারেটর আন্ডার পিপিপি’ শীর্ষক পিপিপি প্রকল্পের আইটিও নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে, সেক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
একই দিনে বিকেলে আরেক চিঠিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উক্ত প্রকল্পের আইটিও নিয়োগের লক্ষ্যে দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সাথে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে এনসিটির ইজারা নিয়ে সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে কি না? তা ছাড়া দেশীয় একটি প্রেসার গ্রুপ টার্মিনালটি নিজেদের কব্জায় নিতে তৎপর বলেও বন্দর সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র দাবি করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে স্থগিত হওয়া এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নতুন সরকারের আমলে আবার সচল হয়। একই বিষয়ে দুই ধরনের নির্দেশনা বন্দরের ভেতরে ও বাইরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- এনসিটি নিয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী?
একই বিষয়ে দুই চিঠি সম্পর্কে জানতে চাইলে নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া শনিবার সকালে বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি অব্যাহত রয়েছে।
প্রথম চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন সচিব বলেন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ থেকে এ বিষয়ে মতামত পাঠানো হয়। ওই মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্র্রহণের জন্য প্রথম চিঠি দেয়া হয়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে নির্দেশনা চাইলে দ্বিতীয় চিঠিতে দরকষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নতুন করে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরদিনই গত শুক্রবার (বন্ধের দিন) দরকষাকষি কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য মূল্যায়ন কমিটি গঠনের চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে সাত সদস্যের মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানানো হয়।
নতুন চ্যালেঞ্জে সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল)-তে বিদেশী অপারেটর নিয়োগের প্রশ্নটি নবগঠিত সরকারের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। টার্মিনালটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেয়ার বিষয়টির সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে সিসিটি (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল)। ডিপি ওয়ার্ল্ড এখন এনসিটির পাশাপাশি বন্দরের আরেক সমৃদ্ধ কনটেইনার টার্মিনাল সিসিটিও চায় এবং সরকার বিষয়টি পিপিপি প্ল্যাটফর্মে আলোচনার জন্য সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অন্যতম প্রতিরক্ষা স্থাপনার সাথে লাগোয়া এনসিটি এবং সিসিটি উভয় টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে গেলে একদিকে প্রাইভেট মনোপলি যেমনি কায়েম হবে। তেমনি বন্দরের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ভারত-মার্কিন-ইসরাইলি লবির হাতে গিয়ে ভূ-কৌশলগত ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। ইতোপূর্বে ইজারা দেয়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালটির অপারেটর সৌদি আরবভিত্তিক হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে আমাদের প্রতিবেশী একটি দেশের কর্মকর্তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রধান প্রধান কেপিআই ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক অপারেটর নিয়োগ কার্যত ভূ-কৌশলগত ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ঘনিষ্ঠ হওয়ায় বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভারত-মার্কিন-ইসরাইলি লবির স্বার্থে ব্যবহৃত হয় কি না সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
আর্থিক লাভালাভের প্রশ্ন
বন্দরের বিদ্যমান আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশই আসে এই এনসিটি ও সিসিটি এই দু’টি টার্মিনাল থেকে। এনসিটিতে বর্তমানে হ্যান্ডলিং এবং স্টোরেজ চার্জ মিলিয়ে প্রতি একক কনটেইনারে আয় হয় ১৬০ ডলারের কিছু বেশি। অপারেশনাল ব্যয় বাদ দিলে প্রতি একক কনটেইনারে নিট আয় ৯৭ ডলার বলে সূত্র জানায়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সর্বশেষ প্রস্তাবনা অনুযায়ী আফ্রন মানি (চুক্তি মূল্য) এবং হ্যান্ডলিং চার্জ মিলিয়ে তা সর্বোচ্চ ৮৫ ডলার পর্যন্ত হয়। তা ছাড়া দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানও এনসিটিতে ইন করার চেষ্টায় আছে। তাদের প্রস্তাবও এনসিটির বিদ্যমান আয়ের চেয়ে কম বলে সূত্র জানিয়েছে।
এনসিটির সাথে সিসিটি যুক্ত করলে বাড়বে ঝুঁকি
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনসিটির বিষয়টি তিনটি সরকারের চলমান আলোচনা এবং দরকষাকষির একটি প্রক্রিয়া। যেহেতু সাত বছর আগে স্বাক্ষরিত জিটুজি এমওইউর আওতায় টার্মিনালটি ইজারার আলোচনা চলছে, ফলে সরকারের সরে আসার সুযোগ নেই। কিন্তু নতুন করে সিসিটি তাদের হাতে দেয়ার আলোচনা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলেও সূত্র দাবি করেছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা বলছেন- এনসিটির বার্ষিক হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ১৫ লাখ টিইইউএস। সিসিটির ক্যাপাসিটি সাত লাখ টিইইউএস। আর সৌদি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়া পিসিটির ক্যাপাসিটি পাঁচ লাখ টিইইউএস। এনসিটি এবং সিসিটি একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিলে তাদের হাতেই চলে যাবে ২২ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিংয়ের কর্তৃত্ব। যা বন্দরের বিদ্যমান কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তা ছাড়া এই দুই টার্মিনালের বাইরে বন্দরের ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডেরও শতভাগ নিয়ন্ত্রণ চায় ডিপি ওয়ার্ল্ড, সেক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষ দিতে চায় ইয়ার্ডটির ৬০ শতাংশের কর্তৃত্ব। শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে শ্রম বাজারের ইস্যু সামনে রেখে দেশটি এনসিটির পাশাপাশি সিসিটিও নিতে চায়, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া যেভাবে শুরু
এনসিটিতে বর্তমানে বার্ষিক হ্যান্ডলিং হয় ১.৩ মিলিয়ন টিইইউএস। টার্মিনালটির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৩৩% রাজস্ব আয় হয়। লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে দেশের ডলার সঙ্কট কাটাতে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার সংযুক্ত আমিরাতকে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালসহ বন্দর খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাইতে পিপিপি জিটুজি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পিপিপি কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দরকষাকষিতে গতি
সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪-এর জুলাই আগস্ট আন্দোলনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার বাংলাদেশীদের ছাড়াতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা যখন ইউএই আমিরকে ফোন করেন তখন ওই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ইস্যুতে আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের অব্যবহিত পরেই ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও সিইও সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে সেবছর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সাইড লাইনের দ্বিপক্ষীয় মিটিংয়ের প্রস্তাব দেন। সে অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ড চেয়ারম্যানের সাথে প্রধান উপদেষ্টার সাইড লাইন মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টাকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এনসিটি প্রকল্পে তাদের আগ্রহ এবং ইতোমধ্যে পতিত সরকারের সময়ে সম্পাদিত জিটুজি এমওইউর কথা স্মরণ করিয়ে দেন বলে সূত্র জানায়। একই সাথে দুবাইয়ের বিশাল শ্রমবাজার এবং সেখানে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ শ্রমিকের ইস্যুও সামনে আনা হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ওই বৈঠকের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তির প্রক্রিয়ায় জোর দেয়। ইতোমধ্যে আইএফসিও ট্রানজেকশন স্ট্রাকচার প্রতিবেদন জমা দেয়।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও কথা বলতে রাজি হননি। তবে একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) চুক্তিতে আরএসজিটির সাথে দেশের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কাজেই দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই নেগোসিয়েশন হওয়া উচিত। বিদেশী অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ট্রানজেকশন এডভাইজর নিয়োগের পাশাপাশি একটি কোর কমিটি কাজ করছে বলেও সূত্র জানায়।



