ক্রীড়া প্রতিবেদক
৫৩তম ওভারের প্রথম বলে মোহাম্মদ আব্বাসকে কাভার দিয়ে চার মেরে তিন অঙ্ক ছোঁয়ার পর হেলমেট খুলে শূন্যে উড়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটার এরপর করেছেন তার সেই চিরচেনা চুমু উদযাপন। সেঞ্চুরি করেই ‘চুমু’টা আসলে কাদের দেন শান্ত।
শান্তর চুমু উদযাপন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের। গত বছরের ডিসেম্বরে শান্ত তার চুমুর গল্প বলেছিলেন। ‘যখন ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছিলাম, তখন এটা (চুমু উদযাপন) করেছিলাম। এরপর এটা আপনা-আপনি হয়ে গিয়েছিল। ড্রেসিংরুমে যারা ছিলেন ক্রিকেটার, কোচিং স্টাফ, সবাই আমাকে সাহায্য করেছিলেন। মূলত ড্রেসিংরুমের উদ্দেশ্যেই করা। আলাদা পরিকল্পনা ছিল না।’
৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারে ১৪ বার ফিফটি ছুঁয়ে ৯টিকেই রূপ দিলেন তিনি শতরানে। সবশেষ পাঁচ টেস্টে তার চতুর্থ সেঞ্চুরি এটি। বাংলাদেশের হয়ে তার চেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি আছে তিনজনের। তবে একটি জায়গায় তিনিই এখন সবার ওপরে। বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড এখন এককভাবে তার। নেতৃত্বের ৩০ ইনিংসে তার পঞ্চম সেঞ্চুরি এটি। ছাড়িয়ে গেলেন তিনি মুশফিকুর রহীমকে (৬১ ইনিংসে ৪টি)। অধিনায়ক হিসেবে ৩১ ইনিংসে মুমিনুল হকের শতরান ৩টি। রেকর্ড ও মাইলফলকের জন্যই শুধু নয়, শান্তর ইনিংসটি ক্রিকেটীয় বিচারেও একদম বিশ্বমানের। প্রতিপক্ষের বোলিং ও পারিপার্শ্বিকতা মিলিয়ে সত্যিকারের শীর্ষমানের ইনিংস।
মিরপুর টেস্টে পাকিস্তানকে হতাশায় ডুবিয়ে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন শান্ত। প্রথম দিনের চা বিরতির ঠিক আগের ওভারে মোহাম্মদ আব্বাসের বলে চমৎকার কভার বাউন্ডারি মেরে ৯৭ রান থেকে কথ্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরিতে (১০১) পৌঁছান তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে এর আগে কখনো পঞ্চাশ পর্যন্ত যেতে পারেননি এই টপঅর্ডার ব্যাটার। প্রথমবার পঞ্চাশের দেখা পেয়েই সেটাকে সেঞ্চুরিতে পরিণত করলেন। ৭১ বলে ফিফটির করার পর পরের ৫০ করতে তিনি খেলেছেন মাত্র ৫৮ বল। ১৩০ বলে দুই ছক্কা ও ১২ চারে ১০১ রান করেন শান্ত। টেস্টে সবশেষ আট ইনিংসে এটি তার চতুর্থ সেঞ্চুরি।
মোহাম্মদ আব্বাসের পরের বল শাফল করে লেগে খেলতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বথ্যাটে-বলে করতে পারেননি বাঁহাতি এই বথ্যাটার। জোরাল আবেদনে আম্পায়ার সাড়া না দিলে রিভিউ নেন শান মাসুদ। তাতে পাল্টায় সিদ্ধান্ত। তার আউটে মুমিনুলকে নিয়ে করা ২৫৭ বলে ১৭০ রানের জুটি ভাঙে।
ফিফটিকে কীভাবে সেঞ্চুরিতে পরিণত করতে হয়, সেটা ভালো করেই জানেন নাজমুল হোসেন শান্ত। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বেশির ভাগ সময় নার্ভাস নাইন্টিতে কাটা পড়লেও শান্ত ছিলেন ব্যতিক্রম। টেস্টে তার ফিফটির চেয়ে সেঞ্চুরির সংখ্যাই বেশি। ৯ সেঞ্চুরি ও ৫ ফিফটি। রেকর্ডে কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, জর্জ হেডলিদের কাতারে চলে এসেছেন শান্ত। বাংলাদেশের বাঁহাতি ব্যাটারের ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার ৬৪.২৯ শতাংশ। এই তালিকায় সবার ওপরে স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ২৯ সেঞ্চুরি ও ১৩ ফিফটি করেছেন। যার ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার ৬৯.০৫।
শান্ত ও ব্র্যাডম্যানের মাঝে আছেন, আরেক ‘ব্র্যাডম্যান’। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তি জর্জ হেডলির ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার ৬৬.৬৭ শতাংশ। তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘ব্ল্যাক ব্র্যাডম্যান’ নামে। শান্তর পরে এই তালিকায় থাকা দু’জনই ভারতীয়। শুবমান গিল ও শেখর ধাওয়ানের ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার ৫৮.৩৩ ও ৫৫.২৬ শতাংশ।
মিরপুরে যখন শান্ত ব্যাটিংয়ে নেমেছেন, তখন বাংলাদেশের স্কোর ১০.১ ওভারে ২ উইকেটে ৩১ রান। মুমিনুল হকের সাথে মিলে ধীরে সুস্থে এগিয়েছেন শান্ত। ভালো বলকে সমীহ করেছেন। বাজে বল পেয়ে সেটাকে বাউন্ডারিতে পরিণত করেছেন দু’জনই (শান্ত-মুমিনুল)। ১২৯ বলে টেস্ট ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন। সেঞ্চুরি পূর্ণ করার ঠিক পরের বলেই আউট হয়েছেন শান্ত। দুই টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরির কীর্তি রয়েছে তার। ২০২৩ সালে মিরপুরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৪৬ ও ১২৪ রান করেছিলেন। পরের জোড়া সেঞ্চুরি করেছেন ২ বছর পর। ২০২৫ সালে গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ১৪৮ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১২৫ রান করে অপরাজিত ছিলেন। আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টেই তিনি হয়েছিলেন ম্যাচসেরা।
টেস্টে ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার
ব্যাটার দল সেঞ্চুরি ফিফটি হার
স্যার ডন ব্র্যাডম্যান অস্ট্রেলিয়া ২৯ ১৩ ৬৯.০৫
জর্জ হেডলি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১০ ৫ ৬৬.৬৭
নাজমুল হোসেন শান্ত বাংলাদেশ ৯ ৫ ৬৪.২৯
শেখর ধাওয়ান ভারত ৮ ৫ ৫৮.৩৩
শুবমান গিল ভারত ১০ ৮ ৫৫.২৬



