নিজস্ব প্রতিবেদক, মোংলা থেকে
সুন্দরবনে এখনো ছয় থেকে আটটি বনদস্যু ও জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। বাহিনীটির দাবি, সুন্দরবনে দস্যু দমনে ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অপরাধচক্র কোণঠাসা হয়ে পড়ায় মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ড স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার পেছনে দস্যু ও তাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
গত ১১ জুন বাগেরহাটের মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থিত কোস্টগার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে একদল দুর্বৃত্ত হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে কয়েকজন কোস্টগার্ড সদস্য আহত হন। হামলার ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তে যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ওই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে বনদস্যু ও তাদের সহযোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। স্টেশন স্থাপনের পর অস্ত্র, রসদ ও লজিস্টিক সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় অসন্তুষ্ট চক্রটি হামলার সাথে জড়িত থাকতে পারে।
গতকাল শুক্রবার মোংলায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনে ছয় থেকে আটটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। প্রতিটি বাহিনীতে সাধারণত ৮ থেকে ১২ জন সদস্য থাকে। বড় বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে অনেক সময় ছোট ছোট উপদল বা ‘ক্লোন’ বাহিনী গড়ে ওঠে। এসব বাহিনী মূলত জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের লক্ষ্য করে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধে জড়িত।
কোস্টগার্ডের দাবি, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে চলমান অভিযানে দস্যুদের সক্ষমতা কমে এসেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে পরিচালিত অভিযানে ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যু ও জলদস্যুকে আটক এবং ৪১ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মেসবাউল ইসলাম বলেন, ‘কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি ও অভিযানের কারণে দস্যুরা আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা কমে এসেছে।’ তার ভাষ্য, এই চাপের মধ্যেই সম্প্রতি কুখ্যাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধানসহ কয়েকজন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনের অসংখ্য সরু খাল ও ন্যারো চ্যানেল এখনো দস্যুদের আত্মগোপনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তবে ড্রোন প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে দুর্গম এলাকাও পর্যবেক্ষণে আনা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৪২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ১টি ককটেল, ১টি টেলিস্কোপ এবং ২টি ওয়াকিটকিসহ ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়। এ সময় দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জনকে জীবিত উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা প্রদান শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিয়মিত অভিযানের ফলে দস্যুরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। যার ফলে সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত ছোট সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা গত ১৭ মে কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে।



