শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড

বিচারকাজে ‘সহযোগিতার প্রস্তাব’ ডিআইজি জলিলের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রায় এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘হত্যার’ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিচরকাজে ‘সহযোগিতার প্রস্তাব’ দিয়েছেন পুলিশের সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল। তবে তিনি রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য লিখিত কোনো আবেদন করেননি বলে তার আইনজীবী বলেছেন।

গতকাল বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ জলিল মণ্ডল জামিনের আবেদনও করেন, যা আদালত নাকচ করে দিয়েছে। আদালতে তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ আলী হায়দার। শুনানিতে আইনজীবী আলী হায়দার বলেন, জলিল মণ্ডল হৃদরোগে আক্রান্ত। তার হার্টে সাতটি ব্লক আছে। এ অবস্থায় তার জামিন চান। তখন ট্রাইব্যুনাল বলেন, একজন বিচারপতি হার্টে ১৭ থেকে ১৮টি ব্লক নিয়ে অফিস করেন। এই জামিন আবেদনের গ্রাউন্ড নেই।

পরে আইনজীবী আলী হায়দার বলেন, ‘আমার (আসামি জলিল) পাসপোর্ট জমা নেন। আমি অ্যাপ্রুভার হতেও রাজি। আমি বিচারকাজে সহযোগিতা করতে চাই। ২০২৪ সালে এই মামলা হয়েছে। আমি পালিয়ে যাই নাই। আমাকে আমার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে।’ ট্রাইব্যুনাল জলিল মণ্ডলের অ্যাপ্রুভার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অবশ্য জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন।

পরে আলী হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাজসাক্ষী হওয়ার কোনো লিখিত আবেদন দেয়া হয়নি। এটি জামিন আবেদনের বিষয়টি বিবেচনার জন্য একটি মৌখিক নিবেদন যে, আমরা ট্রাইব্যুনালকে প্রয়োজনে বিচারকাজে সহযোগিতা করতে রাজি আছি। আমরাও বিচার চাই, আমরা নির্দোষ।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ট্রাইব্যুনালকে বলেছি, প্রয়োজনে অনুমতি দিলে আমরা সাক্ষী হতেও রাজি আছি। আসামি যখন সাক্ষী হয়, তখন তো রাজসাক্ষী দেয়া হয়। এর অর্থ এই নয় যে আমরা লিখিত আবেদন করেছি। আদালত আবেদন আনতে বলেননি, আর আমরাও কোনো আবেদন দাখিল করিনি। জামিন আবেদনেও সাক্ষী বা রাজসাক্ষী হওয়ার বিষয়ে কোনো বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।’

আসামির শারীরিক অবস্থা ও অবস্থান তুলে ধরে এই আইনজীবী বলেন, উনি ঘটনার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নন, সম্পূর্ণ নির্দোষ। তিনি ২০১৭ সাল পর্যন্ত চাকরি করে অবসরে গেছেন। ঘটনার পরে কখনো দেশের বাইরে পালিয়ে যাননি। তিনি ২০২০ সাল থেকে অসুস্থ।’

সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বিচারকাজে কিভাবে সহায়তা করতে চান এমন প্রশ্নে আলী হায়দার বলেন, যেহেতু তখন তিনি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন, তাই এই ঘটনার বিষয়ে যতটুকু জানেন, নিজের অবস্থানে থেকে তা বলতে চান। উনিও চান এরকম একটা ঘটনার যেন সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়।’

আলী হায়দার বলেন, তিনি নিজে মক্কেলের সাথে কথা বলেননি। মামলার মূল আইনজীবী আপিল বিভাগের নুরুল হুদা আনসারী মক্কেলের সাথে কথা বলে এ নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল আইনজীবী অন্য কোর্টে ব্যস্ত থাকায় তিনি শুনানি করেছেন এবং মক্কেলের নির্দেশনা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতার ওই মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছেন।

শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওই সমাবেশের সময় জলিল মণ্ডল ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ-সিএমপির কমিশনার এবং র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গেল মার্চ মাসে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ-ডিবি।

২০১০ সালে হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরে ইসলাম বিরোধী ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে সমাবেশ ডাকে সংগঠনটি। সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা ও তাণ্ডব চলে। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই রাতের অভিযানে ৬১ জন নিহত হন। তবে তৎকালীন পুলিশের দাবি ছিল, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি, আর দিনভর সঙ্ঘাতে নিহতের সংখ্যা ১১।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২০ অগাস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগ জমা পড়ে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও লেখক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, ইমরান এইচ সরকারসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

এর আগে গত বছরের মে মাসে শাপলা চত্বরের ঘটনায় জলিল মণ্ডলসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যে মামলায় তিনি ২ নম্বর আসামি। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে তাকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।