ইরানযুদ্ধে আমিরাতের সামরিক উচ্চাকাক্সক্ষা চূর্ণ

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

Printed Edition

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ধাক্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের অপরাজেয় ইমেজ বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। গত দুই দশক ধরে আবুধাবি যে ‘লিটল স্পার্টা’ হিসেবে নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী মধ্যম শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাতে বড় ফাটল ধরিয়েছে।

আমিরাত বন্দর নির্মাণের মাধ্যমে, বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ করে, ছায়াযুদ্ধ চালিয়ে এবং বড় শক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রেখে নিজের ভৌগোলিক দুর্বলতা ঢেকে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু গত তিন মাসে ইরানের উপর্যুপরি হামলায় তাদের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেই আত্মতুষ্টির আসল চেহারা বেরিয়ে পড়েছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, সঙ্কটের সময় তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুরা পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে। এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীদের নিয়ে জোট গড়তে ব্যর্থ হয়ে আবুধাবি বেশ হতাশ।

আমিরাতি বিশ্লেষক তারেক আল-ওতাইবা আরব সংহতি ও বহুপক্ষীয় জোটের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছেন। অন্য দিকে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এসব হুঁশিয়ারির আড়ালে একটা নির্মম সত্য লুকিয়ে আছে- বছরের পর বছর জমানো টাকা, প্রভাব ও কূটনৈতিক সম্পর্ক কোনোটাই ইরানের সরাসরি হুমকির মুখে আমিরাতকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের নেতৃত্বে আমিরাত ইয়েমেন থেকে সুদান পর্যন্ত প্রক্সি নেটওয়ার্ক, সার্বভৌম তহবিল এবং লজিস্টিকস হাব ব্যবহার করে নিজেদের অপ্রতিরোধ্য দেখানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইরানের রেভুলিউশনারি গার্ড যখন হামলা চালাল, তখন এই বিশাল নেটওয়ার্ক প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। রাশিয়া থেকে আসা বিনিয়োগ এবং ধনকুবেরদের আশ্রয় দিলেও সঙ্কটকালে মস্কোর কোনো সামরিক সহায়তা পায়নি আবুধাবি। চীন শুধু উদ্বেগ জানিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র মৌখিক আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং বৈশ্বিক পুঁজির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কারণেই আমিরাত ইরানের সহজ টার্গেট হয়ে উঠেছে। একবার হামলা করে ইরান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের কাছে বার্তা দিতে পেরেছে যে, আমিরাতও এ অঞ্চলের অন্য ছোট দেশগুলোর মতোই ঝুঁকির মধ্যে আছে।

আমিরাত ইরানের ভেতরে পাল্টা হামলা চালিয়েও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। কারণ যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতায় ইরান অনেক এগিয়ে। এরপর শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ প্রতিবেশীদের কাছে যৌথ সামরিক অভিযানের আহ্বান জানান। কিন্তু সৌদি আরবসহ অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো সাড়া না দেয়ায় আমিরাত এখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রচারণা চালাচ্ছে এবং জিসিসি, আরব লীগ, ওমান-কাতার-পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।

বাস্তবতা হলো, আবুধাবি দীর্ঘদিন জিসিসিকে নিজেদের উচ্চাকাক্সক্ষার পথে বাধা মনে করেছে। এখন বিপদে পড়ে বুঝতে পারছে, প্রতিবেশীদের ছাড়া এ অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমিরাতের নিরাপত্তার একমাত্র টেকসই সমাধান হলো সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত ও বাহরাইনের সাথে একটি সত্যিকারের সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গড়ে তোলা। মধ্যস্থতাকে বিশ্বাসঘাতকতা না ভেবে, আর সৌদির সতর্কতাকে দুর্বলতা না ভেবে বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। ইসরাইলের সাথে সামরিক সহযোগিতাও ইরানের ভৌগোলিক নৈকট্যের ঝুঁকি থেকে আমিরাতকে রক্ষা করতে পারবে না। ‘লিটল স্পার্টা’ একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে- এই ভ্রান্ত ধারণা বাদ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে একসাথে নিয়ে এগোনোই এখন আমিরাতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ।