বিশেষ সংবাদদাতা
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্পগোষ্ঠীর সম্পদ নিলামে তোলার মাধ্যমে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের গভীর সঙ্কটকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। প্রায় ২১৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে এই নিলাম আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে ১৫ তলা ‘জনকণ্ঠ ভবন’সহ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আগ্রহী দরদাতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে এবং অংশগ্রহণের জন্য রিজার্ভ মূল্যের ১০ শতাংশ জমা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
এই নিলাম প্রক্রিয়া অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রথম ধাপে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে ঋণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো, বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে নিলামে প্রত্যাশিত সাড়া অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে ব্যাংকগুলোকে পরবর্তী ধাপে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং জটিল।
গ্লোব জনকণ্ঠ গ্রুপের ঋণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে এই ঋণ অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সনদও দেয়া হয়। কিন্তু ঋণ প্রদানের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে অধিকাংশ ইউনিটই নিষ্ক্রিয়। এমনকি ‘জনকণ্ঠ’ পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, গ্লোব জনকণ্ঠের ওপর বিপুল দেনার চাপ রয়েছে এবং শতাধিক পাওনাদার তাদের অর্থ ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছে। দীর্ঘ দিন আয়কর পরিশোধ না করা, উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং ব্যাংকঋণের চাপ- সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, জনতা ব্যাংক নিজেও বড় ধরনের খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। বেক্সিমকো, এস আলম, থার্মেক্স ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের মতো বড় ঋণগ্রহীতাদের কারণে ব্যাংকটির মোট ঋণের একটি বড় অংশ মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল যাচাই-বাছাই এবং সুশাসনের অভাব ঋণখেলাপির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।



