ক্রীড়া প্রতিবেদক
মাত্র দুই ম্যাচেই ১১ পয়েন্ট যোগ করে টাইগারদের রেটিং এখন ৭৮। বিপরীতে পাকিস্তানের পয়েন্ট ৮৯ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৫-এ।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের টেস্ট ইতিহাসে নতুন এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের জন্ম হলো সিলেটে। পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে শুধু সিরিজ জেতেনি বাংলাদেশ, গড়েছে অনন্য এক বিশ্বরেকর্ডও। টেস্ট ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে এবং নিজেদের ঘরের মাঠে- দুই ভিন্ন সিরিজে ধবলধোলাই করার কীর্তি এখন বাংলাদেশের।
২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের পর এবার দেশের মাটিতে একই প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
এর আগে এই কীর্তি ছিল কেবল অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার। তবে বাংলাদেশের কৃতিত্বকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে আরেকটি তথ্য- পাকিস্তানকে তাদের নিজস্ব মাটিতেও ধবলধোলাইয়ের স্বাদ দিয়েছে একমাত্র বাংলাদেশই। ইংল্যান্ড পাকিস্তানে সিরিজ জিতলেও নিজেদের দেশে কখনো পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করতে পারেনি।
মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে ১০৪ রানের দাপুটে জয়ের পর সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টেস্টে ৭৮ রানে পাকিস্তানকে হারালো স্বাগতিকরা। দুই ম্যাচেই ব্যাটিং, বোলিং ও মানসিক দৃঢ়তায় প্রতিপক্ষকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশ।
র্যাংকিংয়েও ইতিহাস
সিলেট টেস্টের জয় বাংলাদেশের জন্য এনে দিয়েছে আরো একটি বড় সুখবর। আইসিসির হালনাগাদ টেস্ট র্যাংকিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। টেস্ট ইতিহাসে এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অবস্থান।
এর আগে ২০১৮ সালে একবার অষ্টম স্থানে উঠেছিল টাইগাররা। এবার পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে ফেলে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান নেমে গেছে অষ্টমে, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ নবম স্থানে।
বর্তমানে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট ৭৮। সিরিজ শুরুর আগে যা ছিল ৬৭। অর্থাৎ মাত্র দুই ম্যাচেই ১১ রেটিং পয়েন্ট যোগ হয়েছে টাইগারদের ঝুলিতে। বিপরীতে পাকিস্তানের পয়েন্ট ৮৯ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৫-এ।
বাংলাদেশের ওপরে এখন রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৮৬), নিউজিল্যান্ড (১০১), ইংল্যান্ড (১০২), ভারত (১০৪), দক্ষিণ আফ্রিকা (১১৯) ও শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়া (১৩১)।
চলমান বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রেও বাংলাদেশের অবস্থান এখন পঞ্চম। আগের চক্র শেষে যেখানে ছিল সাত নম্বরে। ফলে নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে দল যে নতুন উচ্চতায় উঠছে, তারই বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে র্যাংকিং ও পারফরম্যান্সে।
বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
সিরিজ শুরুর আগেই অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেছিলেন, এই চক্রে বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকবে শীর্ষ পাঁচে থাকা। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় সেই লক্ষ্যপূরণ হয়েছে।
এই সিরিজে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ দলীয় পারফরম্যান্স। ব্যাটিং বিভাগে মুশফিকুর রহিমের অভিজ্ঞতা, লিটন দাসের ধারাবাহিকতা এবং মুমিনুল হকের দৃঢ়তা দলকে শক্ত ভিত দিয়েছে। অন্য দিকে বোলিং বিভাগে পেস ও স্পিনের দুর্দান্ত সমন্বয় পাকিস্তানকে পুরো সিরিজেই চাপে রেখেছে।
বিশেষ করে স্পোর্টিং উইকেটে বাংলাদেশের পেসারদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। তরুণ পেসার নাহিদ রানা নিজের গতি ও আগ্রাসনে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের আতঙ্কে রেখেছেন পুরো সিরিজে। অন্য দিকে বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছেন প্রতিপক্ষের কাছ থেকে।
সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে একাই ৬ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দেন তাইজুল। দুই ইনিংস মিলিয়ে তার শিকার ৯ উইকেট। পুরো সিরিজে সর্বোচ্চ ১৩ উইকেটও তার দখলে।
ব্যাট হাতে সিরিজসেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম। দুই টেস্টে তার সংগ্রহ ২৫৩ রান। আর ম্যাচসেরা লিটন দাস করেছেন ২৩৯ রান, যার মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ সেঞ্চুরি।
বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলও দলের ব্যাটিং ধারাবাহিকতায় সন্তুষ্ট। তার ভাষায়, গত ছয় মাসে ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ ধারাবাহিক। গত বছর আয়ারল্যান্ড এবং চলতি বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ চার টেস্টে এসেছে সাতটি সেঞ্চুরি ও ১৪টি ফিফটি।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মুমিনুল হকের টানা পাঁচ ইনিংসে পাঁচ ফিফটির নজিরও।
ডোনাল্ড থেকে ওয়াসিম-বাংলাদেশ বন্দনায় কিংবদন্তিরা
বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক সাফল্য বিশ্ব ক্রিকেটেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাবেক পেস বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড বাংলাদেশের কৃতিত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘ইতিহাস পূর্ণ হলো, কারণ বাংলাদেশ পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে এবং এখন নিজেদের মাটিতে হারিয়েছে। এটি বিশাল ও স্মরণীয় অর্জন।’
পাকিস্তানের কিংবদন্তি পেসার ওয়াসিম আকরামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ‘কমপ্লিট ক্রিকেট’ খেলেছে। একসময় তাদের উইকেট ছিল ধীরগতির ও স্পিন-সহায়ক। কিন্তু এখন তারা এমন উইকেট বানাচ্ছে, যেখানে তাদের পেসাররা গতিতে পাকিস্তানকেই টেক্কা দিচ্ছে।’
বিশেষভাবে নাহিদ রানার প্রশংসা করে ওয়াসিম বলেন, বাংলাদেশ এখন টেস্ট ক্রিকেটের সেরা দলগুলোর সাথে লড়াই করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। নাহিদ রানা অসাধারণ প্রতিভাবান।
সিলেটে শেষ হাসি বাংলাদেশের
৪৩৭ রানের কঠিন লক্ষ্য সামনে নিয়ে শেষ দিনে ব্যাট করতে নেমেছিল পাকিস্তান। চতুর্থ দিন শেষে তাদের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান। হাতে ছিল তিন উইকেট, প্রয়োজন আরো ১২১ রান।
মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান পঞ্চম দিনের শুরুতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। দিনের শুরুতেই নাহিদ রানার বলে রিজওয়ানের ক্যাচ ফেলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর অষ্টম উইকেটে ৫৪ রানের জুটি গড়ে ম্যাচে ফেরার ইঙ্গিত দেয় পাকিস্তান।
তবে আবারো বাংলাদেশের ত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হন তাইজুল ইসলাম। ৯৬তম ওভারে তার বলে স্লিপে শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে ২৮ রানে ফেরেন সাজিদ খান। পরের ওভারেই শরিফুল ইসলামের বলে গালিতে মিরাজের হাতে ধরা পড়েন ৯৪ রান করা রিজওয়ান।
এরপর আর প্রতিরোধ গড়তে পারেনি সফরকারীরা। তাইজুলের বলেই শেষ উইকেট হারিয়ে ৩৫৮ রানে অলআউট হয় পাকিস্তান।
বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে তাইজুল নেন ৬ উইকেট। নাহিদ রানা শিকার করেন ২ উইকেট। শরিফুল ইসলাম ও মিরাজ পান একটি করে উইকেট।
এর আগে প্রথম ইনিংসে লিটন দাসের সেঞ্চুরিতে বাংলাদেশ তোলে ২৭৮ রান। জবাবে পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ২৩২ রানে। ৪৬ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৩৯০ রান। ফলে পাকিস্তানের সামনে দাঁড়ায় ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্য স্পর্শ করতে পারেনি সফরকারীরা। ইতিহাসের পাতায় নতুন গৌরবগাঁথা লিখে শেষ হাসিটা হাসে বাংলাদেশই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ইনিংস : ২৭৮ ও ৩৯০।
পাকিস্তান ইনিংস : ২৩২ ও (লক্ষ্য ৪৩৭) ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ (রিজওয়ান ৯৪, সাজিদ ২৮, শরিফুল ১/২৯, নাহিদ ২/৭১, মিরাজ ১/৬২, তাইজুল ৬/১২০)।
ফল : বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী।
সিরিজ : ২-০ তে বাংলাদেশ জয়ী।
ম্যাচ সেরা : লিটন দাস।
সিরিজ সেরা : মুশফিকুর রহীম।



