- সরকারি ক্রয় কমিটির সভায় শনিবার উঠছে প্রস্তাব
- সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আগাম পদক্ষেপ
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মোট ১৭ লাখ মেট্রিকটন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক তিনটি পৃথক দরপত্র ও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে ডিজেল ও অকটেন সংগ্রহের প্রস্তাব শনিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় উপস্থাপন করা হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বিবেচনায় আগাম মজুদ নিশ্চিত করতে এই বৃহৎ আমদানি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন খাত, কৃষি সেচ ও শিল্প কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘœ রাখতে এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ডিবিএস ট্রেডিং হাউজ এফজেডসিওর কাছ থেকে মোট ১১ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ লাখ মেট্রিকটন ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম মানের ডিজেল এবং এক লাখ মেট্রিকটন অকটেন। এই ডিজেল মূলত উচ্চমানসম্পন্ন নিম্ন সালফারযুক্ত জ্বালানি, যা পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে তুলনামূলকভাবে উন্নত বলে বিবেচিত।
একই সভায় ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে এক লাখ মেট্রিকটন ৫০ পিপিএম সালফার মানের ডিজেল আমদানির প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। এই ডিজেলও পরিবহন ও শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য উপযোগী এবং নিম্ন সালফার মাত্রার কারণে বায়ুদূষণ কমাতে সহায়ক।
অন্য দিকে কাজাখাস্তান গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপির কাছ থেকে পাঁচ লাখ মেট্রিকটন ডিজেল আমদানির পৃথক প্রস্তাবও একই সভায় উপস্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে তিনটি উৎস থেকে মোট ১৭ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে সরকার আগামী কয়েক মাসের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে চায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বর্তমানে কৃষি মৌসুম, পরিবহন চাহিদা ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে ডিজেলের ব্যবহার বেড়েছে। একই সাথে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি তেলের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে আগাম আমদানির মাধ্যমে বাজারে কোনো ধরনের সঙ্কট তৈরি না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে সাম্প্রতিক ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিতে এখনই বড় পরিসরে ক্রয় কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে আমদানি বিল বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও সরবরাহ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বড় আমদানি সিদ্ধান্ত এক দিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখবে, অন্য দিকে মূল্য পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার আগে আগাম চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করা হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করছেন, আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া গেলেও দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ জ্বালানি আমদানিতে সামান্য মূল্য পার্থক্যও সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলার বাজার ও আমদানি ব্যয়ের বর্তমান চাপের মধ্যে এত বড় পরিমাণ জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি দেশের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা উচিত।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির শনিবারের সভায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পেলে দ্রুত এলসি খোলা এবং সরবরাহ সূচি চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে এসব জ্বালানি তেল দেশে পৌঁছাবে এবং বিপিসির বিভিন্ন ডিপোতে সংরক্ষণ করা হবে।
জ্বালানি বিভাগ মনে করছে, আগাম এ আমদানি উদ্যোগ দেশের বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করবে।



