পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে সঙ্ঘাত সহিংসতা

বাংলাদেশের চার পাশেই বাড়তে পারে নিরাপত্তাঝুঁকি

Printed Edition

এস এম মিন্টু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসংলগ্ন রাজ্যগুলোতে বিজেপি মতায় আসায় বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কৌশলগত বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপিশাসিত রাজ্য সরকারগুলোর কেন্দ্রীয় নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কারণে সীমান্তে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক দিকে যেমন ভারত আমাদেরকে শতভাগ বন্ধু ভাবছে না, আরেক পাশে মিয়ানমারে চলছে অস্থিরতা। ফলে বাংলাদেশের চার পাশের সীমান্তগুলো বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের সীমান্তের চার পাশে বিজিবির পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ অন্যন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থেকে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচনের পর; বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে সঙ্ঘাত ও খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে; এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) গোয়েন্দা সূত্র নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত এবং সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তায় সবধরনের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শত্রুপক্ষ যেন কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যপারে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে ভারতীয় রাজ্য সরকারগুলো সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে দ্রুত জমি বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে এবং অনুপ্রবেশ শূন্যে নামিয়ে আনার ল্য নির্ধারণ করেছে। এর জবাবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা এবং ড্রোন বা থার্মাল ক্যামেরার মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাভাষীদের তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ সাব্যস্ত করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নিলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক ও মাঠপর্যায়ে শক্ত অবস্থান বজায় রাখা প্রয়োজন। ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য উভয়পর্যায়ে বিজেপির আধিপত্যের কারণে তিস্তা বা গঙ্গা পানি বণ্টন এবং সীমান্ত হত্যার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে আলোচনা আরো জটিল হতে পারে। তাই ভারতের কেন্দ্রের সাথে আলোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলোর সাথেও জোরালো কূটনৈতিক যোগাযোগ রা করা জরুরি হতে পারে। ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলোতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার ঝুঁকি থাকে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি বজায় রাখতে। এ জন্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত।

তারা বলছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন সামরিক ঘাঁটি ও নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরা সমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সামগ্রিকভাবে ভারতের রাজনৈতিক এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা মোকাবেলায় প্রতিরা ও কূটনীতি উভয় েেত্রই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের পর সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপরে নানা ধরনের নির্যাতন ল করছি। শুধু তাই নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মী, প্রার্থী হয়েছেন তারাও এই নির্বাচন-পরবর্তী আক্রমণ বা সঙ্ঘাত-সহিংসতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তার মানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা পাশের ঘরে যখন সঙ্ঘাত-সহিংসতা কিংবা অস্থিরতা থাকে তখন তার ঢেউ বা উত্তাপ বাংলাদেশেও ছড়াবে। সেই প্রশ্নে আমরা বলছি যে, আমাদের সীমান্তে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা তা আরো জোরদারের পাশাপাশি সীমান্তবাহিনীকে আরো সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত এখানে যাদেরকে আমরা সংখ্যালঘু বলছি তারা কিন্তু আমার পাশের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা তাদের ওপরে যে ঘটনাগুলো দেখছি সেটি সত্য মিথ্যা বাস্তব-অবাস্তব সোশ্যাল মিডিয়ার বা এআই জেনারেটেড সেটি আরেক ধরনের প্রসঙ্গ; কিন্তু এই ঘটনাগুলো কিন্তু তাদেরকে প্রভাবিত করে। আমাদের ধর্মীয় মতাদর্শের ওখানে যারা আছেন যাদের ওপরে তারা চাইলেই আক্রমণ, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, নাগরিক হিসেবে অসম্মান করা বা মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা কিন্তু তাদের জন্য সহজ এবং তার কিছুৃ আলামত বা ঘটনাও কিন্তু ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়েছে। সেখানে মুসলিমরা একটা আতঙ্কের মধ্যে আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই আতঙ্ক কি থামবে? একটা নির্বাচন-পরবর্তী জয়-পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তাণ্ডব চলে। সেই তাণ্ডব একটা সময় গিয়ে থেমেও যায়; কিন্তু যদি সেটি না থামে তাহলে বুঝতে হবে যে, এই তাণ্ডবের যে ল্য সেটি কিন্তু শুধু তার দেশের মধ্যেই নয়, এই তাণ্ডব চার পাশে ছড়ানো।

একটা বিষয় আমাদের এখানে মনে রাখা প্রয়োজন; আমার প্রতিবেশী আমার থেকে সব অংশে বড়। কিন্তু সে তার বড়ত্ব নিয়ে থাকবে, তার লড়াই অগ্রগতি চলবে; কিন্তু আমার যতটুকু অবস্থান, আমার যতটুকু সমতা বা মর্যাদা সেটি নিয়ে আমাকেও মর্যাদার সাথে থাকতে হবে। তারপরও আমরা মনে করি, যেহেতু দু’টি রাষ্ট্রই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাই দুই দেশের মধ্যে সমস্যা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তবেই দুই দেশের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আস্থার সাথে এগিয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনের আগেই ওই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে আসছেন। কারণ ধর্মীয়ভাবেও তিনি কট্টরপন্থী। তার সাথে তাল মিলিয়ে সুভেন্দ্রও একই বক্তব্য দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলের পর তার নমুনাও দেখা যাচ্ছে। সেখানে মুসলমানদের ভোটার থেকে বাদ দেয়াটাই এবারের নির্বাচনের মূল মেকানিজম ছিল। কারণ প্রায় ৭০ লাখ মুসলমানকে ভোটারিধাকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মূলত মমতার হারের পেছনে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল। ফলাফলের পর তারা মুসলমানদের ওপর হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছে।

তাদের এই কৌশল বাংলাদেশের সীমান্তগুলোতে চাপ সৃষ্টি করা।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত আমাদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী তথা সশস্ত্রবাহিনীকে পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব বাড়ানো উচিত। শুধু প্রতেবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক থাকলেই হবে না, অন্যান্য দেশে গিয়ে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মশালা, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করতে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের তিন দিকে ভারতের সীমান্ত আর এক পাশে মিয়ানমার। ভারত আমাদের কখনোই বন্ধু ভাবে না আবার মিয়ানমার অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের মধ্যে আছে। ফলে চার পাশের সীমান্তই আমার জন্য বড় ঝুঁকি। যদিও তারা তারা আমাদের ওপর সরাসরি কিছু করতে পারবে না তবুও আমাদের সীমান্ত বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্রবাহিনীকেও সক্রিয় অবস্থায় সতর্ক থাকতে হবে।