অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দৃশ্যমান কোনো প্রণোদনা না থাকলেও প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ বছরের বাজেট পরবর্তি পুঁজিবাজার ইতিবাচক সাড়া পেল বিনিয়োগকারীদের। রোববার বাজেট পরবর্তী প্রথম দিনের লেনদেনে দেশের দুই পুঁজিবাজারের আচরণে তারই প্রতিফলন দেখা গেল। ঢাকা শেয়ারবাজারে প্রধান সূচকটি এবং চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে সবগুলো সূচকই শতকের ঘর পার করল গতকাল যা ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের সর্বোচ্চ উন্নতি। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, তাৎক্ষণিক কোনো প্রণোদনা না থাকলেও বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য যেসব নীতি সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা বিনিয়োগকারীদের বাজারের ওপর আস্থার মনোভাব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন ছিল গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজার আচরণে।
সূচকের উন্নতি দিয়েই রোববার লেনদেন শুরু করে দুই পুঁজিবাজার। বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই বাজার আচরণ ছিল বেশ সাবলিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫০ পয়েন্ট ছাড়ায়। এ পর্যায়ে সাময়িকভাবে নিম্নমুখী হলেও দ্রুত তা কাটিয়ে ওঠে বাজারটি। দিনের বাকি সময় আর কোনো বিক্রয়চাপের মুখে পড়তে হয়নি বাজারটিকে। এতে দিনশেষে সূচকটি ১০৪ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পাঁচ হাজার ৫২০ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৬২৫ দমমিক ৩৪ পয়েন্টে। আর এভাবে ২০২৪ সালের পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি আবার পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৮৯ ও ১৪ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট।
অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক রোববার ১৬৪ দশমিক ৫১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে ১৫ হাজার ১৯৫ দশমিক ৭০ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি ওইদিন লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৩৬০ দশমিক ২২ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২২৮ দশমিক ২১ ও ১০৩ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট।
তবে সূচকের তুলনায় লেনদেনের গতি ছিল কিছুটা শ্লথ। ঢাকায় লেনদেনের উন্নতি ঘটলেও কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ১২০ কোটি টাকা বেশি। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ৩৪ কোিিট টাকা থেকে ২৪ কোটিতে নেমে আসে লেনদেন। সূচকের উন্নতির তুলনায় লেনদেনের এই গতিকে কিছুটা কম মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, হতে পারে এটা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। হঠাৎ করে সূচকের বড় উন্নতি ঘটলে সংশোধনের আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই এ সময় বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকেন। তবে তাদের মতে, ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই তিনটি খাতের ভাল কোম্পানিগুলোই গতকাল পুঁজিবাজার সূচকের বড় উন্নতিতে অবদান রেখেছে। গতকাল দুই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে উঠে আসা উল্লিখিত খাতের কোম্পানিগুলোর মূল্যস্তর এখনো অনেক নিচে। তাই এ মুহূর্তে বাজারে বড় ধরনের সংশোধনের আশঙ্কা নেই।
দিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় গতকাল পুঁজিবাজারের ভালো মানের কোম্পানিগুলোর প্রতিই সবার ঝোঁক ছিল। তাই বেশ কিছুদিন থেকে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা দুর্বল কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই গতকাল দরপতনের শিকার হয়। পক্ষান্তরে, ব্যাংক, বীমাসহ অন্য খাতগুলোর মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। লেনদেনের দিক থেকেই আগের দিনগুলোর তুলনায় বেশ খানিকটা এগিয়ে ছিল এসব কোম্পানি। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই এটাকে দীর্ঘ দিন পর পুঁজিবাজারকে তার স্বাভাবিক আচরণে ফেরার ইঙ্গিত মনে করছেন।
এ দিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে উল্লেখ করে স্বাগত জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটির মতে, শেয়ারবাজারের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাজেটে যে সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, তা সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। গতকাল ডিবিএর পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বাজেটকে এভাবেই মূল্যায়ন করেন। এ জন্য তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের স্বার্থে একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক শেয়ারবাজার গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি এবারের বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে, তা দেশের শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তিনি মনে করেন, বাজেটে পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার যে সুস্পষ্ট নীতিগত ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা ডিবিএ গভীর সন্তুষ্টির সাথে গ্রহণ করেছে।
ডিবিএ সভাপতির মতে, শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থসংরক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি, বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প উৎস হিসেবে বন্ড বাজার সম্প্রসারণ, করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড ও সুকুকের উন্নয়নে অগ্রধিকার প্রদান, সম্ভাবনাময় ও যোগ্য কোম্পানির তালিকাভুক্তি সহজ করতে লিস্টিং প্রক্রিয়া পর্যালোচনা ও সরলীকরণের উদ্যোগ, তথ্য প্রকাশ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং ব্যবসাবান্ধব করার পরিকল্পনাকেও তিনি স্বাগত জানান।
তিনি আরো বলেন, করপোরেট বন্ড বাজারের সম্প্রসারণের পাশাপাশি মিউনিসিপ্যাল বন্ড চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পরিবর্তে ইক্যুইটি-ভিত্তিক অর্থায়নকে উৎসাহিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং শক্তিশালী শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বেসরকারি খাতনির্ভর বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরিকল্পনা দেশের শেয়ারবাজারের বিকাশে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।



