জাদুঘরের প্রথম গ্যালারিতে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, এখানে ইতিহাস মানুষের গল্প দিয়ে শুরু হয় না। শুরু হয় মাটি দিয়ে, পাথর দিয়ে, সময় দিয়ে। কাচের ভেতরে সাজানো আছে নানা ধরনের খনিজ পদার্থ, মিনারেল, পাথর। হাজার হাজার, কখনো লাখ লাখ বছরের পুরনো এসব পাথর নীরবে পড়ে আছে। কোনো রাজা নেই, কোনো যুদ্ধ নেই, কোনো ভাষা নেই- শুধু পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাস। একটি পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো- মানুষের ইতিহাস এখানে খুবই সাম্প্রতিক। আমরা যে সময়কে দীর্ঘ বলে ভাবি, এই পাথরের কাছে তা কিছুই না। পৃথিবী মানুষ আসার অনেক আগেই ছিল, আর মানুষ চলে যাওয়ার পরেও থাকবে। এই গ্যালারিতে হাঁটতে হাঁটতে এক ধরনের বিনয় জন্ম নেয়। মানুষের সব অর্জন, সব অহঙ্কার যেন হঠাৎ খুব ছোট মনে হয়। একটি মিনারেলের পাশে লেখা তথ্যফলকে কয়েকটি সংখ্যা- হাজার বছর, লাখ বছর, এসব পড়তে পড়তে সময়ের ধারণাটাই বদলে যায়। ইতিহাসের এই সূচনাটা খুব নিঃশব্দ; কিন্তু ভীষণ গভীর। এখান থেকেই বোঝা যায়, এই জাদুঘর ভ্রমণ শুধু চোখের নয়, চিন্তারও।
খনিজ আর পাথরের গ্যালারি পেরিয়ে যখন পরের অংশে এলাম, তখন মানুষের অস্তিত্ব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করল। প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন, পাথরের তৈরি হাতিয়ার, পোড়ামাটির টুকরা সব কিছুতেই মানুষের ছাপ। এগুলো দেখে মনে হলো, মানুষ প্রকৃতির মাঝেই প্রথম নিজের জায়গা তৈরি করেছিল। পাথরই ছিল তার প্রথম অস্ত্র, প্রথম হাতিয়ার। এসব নিদর্শনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি, নামহীন সেই মানুষগুলো কেমন করে বেঁচে ছিল, কীভাবে তারা পৃথিবীকে বুঝতে শিখেছিল।
এক গ্যালারি থেকে আরেক গ্যালারিতে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে শিলালিপি আর ভাস্কর্য। পাথরের গায়ে খোদাই করা অক্ষরগুলো পড়তে গিয়ে মনে হয়, মানুষ একসময় অনুভব করেছিল- সবকিছু মনে রাখা যায় না, কিছু লিখে রাখতে হয়। এই অক্ষরগুলো শুধু ভাষার পরিচয় নয়, ক্ষমতা, বিশ্বাস আর শাসনেরও চিহ্ন। কোনো কোনো শিলালিপি ভাঙা, কোনোটি ক্ষয়ে গেছে, তবু যা রয়ে গেছে, সেটুকুই আজ আমাদের জানার জন্য যথেষ্ট।
একটি গ্যালারিতে দেখলাম হাজার বছরের পুরনো অনেক মূর্তি। বৌদ্ধধর্ম, হিন্দুধর্মের দেবতাদের মূর্তি। এগুলো শত শত বছর আগে নিখুঁতভাবে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো দেখে মনে হলো মানুষ কতটুকু ভক্ত ছিল তাদের ধর্মের। ধর্মের অনুপ্রেরণায় তারা এই প্রায় অসাধ্য কাজ নিখুঁতভাবে করেছে। হয়তো তারা এর থেকে আধুনিক কিছু আবিষ্কার করেছিল; কিন্তু সেগুলো এখনো উদ্ধার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
মুদ্রার গ্যালারিতে এসে দাঁড়ালে ইতিহাস যেন হাতের মুঠোয় চলে আসে। প্রাচীন আমলের সব মুদ্রা। মামলুক আমল, মুঘল আমল, সুলতানি আমলের সব পুরনো স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা। ছোট ছোট ধাতব মুদ্রার গায়ে শাসকের নাম, প্রতীক, কখনো সাল। এগুলো একসময় মানুষের হাতে হাতে ঘুরেছে, বাজারে চলেছে, দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। আজ কাচের ভেতরে সাজানো, আলোয় ঝলমল করছে। এই পরিবর্তনটিই ইতিহাসের স্বভাব- যা একদিন ছিল ব্যবহারিক, আরেক দিন তা হয়ে ওঠে স্মৃতি।
মুসলিম শাসনামলের নিদর্শনগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, এই ভূখণ্ড কত সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। স্থাপত্যের ভগ্নাংশ, অলঙ্করণ, শিলালিপি- সব কিছুতেই এক ধরনের পরিমিত সৌন্দর্য। এখানে রাজকীয় জাঁকজমক যেমন আছে, তেমনি আছে ধর্মীয় ভাবনা আর প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চিহ্ন। ইতিহাস এখানে কোনো একরঙা রেখা নয়; বরং স্তরে স্তরে জমা হওয়া বহু রঙের গল্প।
এই সব গ্যালারি পেরোতে পেরোতে খেয়াল করলাম, দর্শনার্থীরাও খুব স্বাভাবিকভাবেই চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। কেউ জোরে কথা বলছে না, কেউ তাড়াহুড়া করছে না। মনে হয়, এই জায়গাটি নিজেই মানুষকে ধীরে চলতে শেখায়।
আদিবাসীদের শিল্প সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য রয়েছে আলাদা একটি গ্যালারি। সেখানে আদিবাসীদের পোশাক-আশাক, ব্যবহার্য আসবাব, খাবারের পাত্র, হাঁড়ি-পাতিলসহ অনেক ঐতিহ্যের সমাহার। এগুলো দেখে মনে হলো, তাদের জীবন কত বৈচিত্র্যময়। কত ভিন্ন তাদের সংস্কৃতি।
শিল্পকলা আর লোকসংস্কৃতির গ্যালারিতে এসে রঙের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, গ্রামবাংলার দৃশ্য- সব কিছুতেই জীবনের ছাপ। কিছু ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো- শিল্পী শুধু দৃশ্য আঁকেননি, তিনি সময়ের অনুভূতিও ধরে রেখেছেন। নদী, মাঠ, মানুষের মুখ- সব কিছুতেই সেই সময়ের বাস্তবতার ছোঁয়া লেগে আছে।
লোকশিল্পের অংশে এসে ইতিহাস যেন আরো কাছে চলে এলো। নকশিকাঁথা, মাটির খেলনা, গ্রামীণ ব্যবহারের জিনিস- এসব দেখে মনে হলো, এটিই আসল জীবন। রাজা-বাদশাহর ইতিহাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্পগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃতি কোনো একদিনে তৈরি হয় না; তা গড়ে ওঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতে। বাদ্যযন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কল্পনা করলাম, এই যন্ত্রগুলোর শব্দ কেমন ছিল। কোনো উৎসবের রাতে, কোনো আনন্দের মুহূর্তে কিংবা কোনো ধর্মীয় আচার- এই যন্ত্রগুলোই হয়তো মানুষের অনুভূতির ভাষা হয়ে উঠত। শব্দ আজ আর শোনা যায় না; কিন্তু যন্ত্রগুলো দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে।
এই সবকিছু পেরিয়ে যখন সাহিত্য গ্যালারিতে এলাম, তখন মনে হলো ইতিহাসের আরেকটি দরজা খুলছে। এখানে ঢুকতেই পরিবেশ বদলে গেল। বাঙলা সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রা যেন একসাথে হাজির। একে একে পরিচিত হলাম বাঙলার সব বড় বড় সাহিত্যিকদের সাথে। তাদেরকে চিনলাম। কবি ফররুখ আহমদের ছবি দেখতেই তার লেখা পাঞ্জেরি কবিতার কথা মনে পড়ল। মনে মনে কবিতাটির কিছু লাইন আবৃত্তি করলাম। পল্লীকবি জসীমউদদীনের মায়াবী চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তার কবিতার প্রতিটি লাইনই মায়ায় ভরা। কেউ প্রতিবাদের ভাষায় লিখেছেন, কেউ প্রেমের, কেউ বিষাদের, কেউ আশার। এখানে এসে বোঝা যায়, সাহিত্য আসলে জাতির মনের ইতিহাস। এই গ্যালারিতেই আমি থেমে গেলাম একটি বিশেষ জায়গায়, একপাশে একটি বুকসেলফের সামনে। সেখান থেকে বিদ্রোহী কবি নজরুলের লেখা কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা হাতে নিলাম। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিদ্রোহী কবিতায় থেকে গেলাম এক নিঃশ্বাসে কিছু লাইন পড়ে ফেললাম কবিতাটির, তারপর ধীরে ধীরে পুরো কবিতাটি পড়লাম। শব্দগুলো জোরে পড়িনি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিটি পঙ্ক্তি যেন ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। এই বিদ্রোহ শুধু কোনো শাসকের বিরুদ্ধে নয়, এটি অন্যায় আর স্থবিরতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান।
কবিতাটি পড়ে মনে হলো- ইতিহাস আর সাহিত্য এখানে এসে একে অপরের সাথে মিশে গেছে। শব্দে যে বিদ্রোহ জন্ম নেয়, একদিন তা বাস্তবে রূপ নেয়। বইটি আবার জায়গামতো রেখে দিলাম। মনে হলো- এতক্ষণে ভেতরে একটি প্রস্তুতি তৈরি হয়েছে।
এই প্রস্তুতি নিয়েই আমি ধীরে ধীরে সাহিত্য গ্যালারি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। সামনে অপেক্ষা করছে ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। কিন্তু সেই পথে পা বাড়ানোর আগে, প্রথম পর্ব এখানেই থামিয়ে দিলাম- মাটির গভীরতা, মানুষের সৃজন আর সাহিত্যের আগুন দিয়ে ভেতরটা ভরে নিয়ে।
কিছুটা এগোতেই আরেকটি গ্যালারিতে ঢুকলাম, যেখানে চোখে পড়ে ক্যানভাসজুড়ে মানুষের গল্প। এখানকার পরিবেশ আগের চেয়ে আলাদা- আলো একটু উজ্জ্বল, দেয়ালে সারি সারি শিল্পকর্ম। এই গ্যালারিতে এসে বোঝা যায়, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষের চিন্তাভাবনা, প্রতিবাদ শুধু লিখে প্রকাশ করা হয় না, আঁকাও হয়। এক পাশে ঝুলছে জয়নুল আবেদীনের নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় আকা ‘বিদ্রোহী গরু’। দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। কত কষ্টই না পেয়েছে তারা।
আরেক পাশে কামরুল হাসানের কাজ। তার ছবিতে রঙের ব্যবহার বেশি, ভঙ্গি আরো তীক্ষè। এখানে ব্যঙ্গ আছে, প্রতিবাদ আছে, সমাজের দিকে তাকিয়ে থাকা এক ধরনের স্পষ্ট দৃষ্টি আছে। জয়নুল আবেদীনের নীরব ক্ষুধার পর কামরুল হাসানের শিল্পে এসে মনে হলো- সংগ্রামের ভাষা বদলেছে; কিন্তু প্রশ্ন বদলায়নি। দেখে মনে হলো- হাতে একেও প্রতিবাদ সংগ্রাম করা যায়।
এবার প্রবেশ করলাম পাণ্ডুলিপি গ্যালারিতে। হাতের লেখায়, পুরনো কাগজে , তালের পাতায় লেখা সব আদি প্রাচীন লেখনী। কাচের ভেতরে সাজানো প্রাচীন পাণ্ডুুলিপিগুলো দেখে মনে হলো- জ্ঞান সংরক্ষণ এক সময় কতটা ধৈর্যের কাজ ছিল। শত বছর আগের হাতের লেখা, পাতার কিনারায় পোড়া ধূসর দাগ, তবু অক্ষরগুলো এখনো স্পষ্ট। এখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, ইতিহাস শুধু বড় ঘটনার নয়, দীর্ঘ শ্রমেরও ফল। একটি পাণ্ডুুলিপি থেকে একটু পড়ার চেষ্টা করলাম; কিন্তু পারলাম না। জানি না কী লেখা আছে।
একটি গ্যালারিতে রাখা শত বছর আগের হাতে লেখা কুরআনের দিকে তাকিয়ে কেবল এটুকুই মনে হলো- মানুষ বিশ্বাস, জ্ঞান আর ভাষাকে ধরে রাখার জন্য কত যতœ নিয়েছে।
পাণ্ডুুলিপি গ্যালারি পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম ভাষা আন্দোলনের গ্যালারির দিকে। এখানকার পরিবেশ আরো সংযত, আরো ভারী। দেয়ালজুড়ে আলোকচিত্র, দলিল, পোস্টার। পরিচিত সাল, পরিচিত মুখ। কিন্তু এখানে এসে সবকিছু বইয়ের পাতার বাইরে বেরিয়ে আসে। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়- এরা কেউ জানত না, তারা ইতিহাস হয়ে যাবে। তারা শুধু জানত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। ভাষার জন্য জীবন দেয়ার এই দৃশ্যগুলো দেখে বোঝা যায়, পরিচয়ের প্রশ্ন কত গভীর হতে পারে। ভাষা আন্দোলনের গ্যালারি ছেড়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের গ্যালারিতে ঢুকলাম, মুক্তিযুদ্ধের গ্যালারিটি সব থেকে বড়। আলো কম, চারপাশে স্তব্ধতা। কাচের ভেতরে রাখা অস্ত্র, পোশাক, চিঠি, মানচিত্র, সে সময়ের বিভিন্ন নিউজপেপার কাটিং- সব মিলিয়ে ১৯৭১ যেন সামনে এসে দাঁড়ায়।
একটি আলোকচিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। ছবিতে ধরা পড়া মুখগুলো কোনো প্রতীক নয়, তারা মানুষ। এই গ্যালারিতে হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়, স্বাধীনতা কোনো একদিনের ঘটনা নয়; এটি অসংখ্য মানুষের ত্যাগের সমষ্টি। এখানে এসে সাহিত্যের বিদ্রোহ, শিল্পের প্রতিবাদ, ভাষার সংগ্রাম- সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলে যায়।
বিশ্বসভ্যতার গ্যালারিতে সবথেকে বেশি সময় কাটিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল পৃথিবীর পুরো ইতিহাস একনজরে দেখব। কিন্তু সেটি হয়ে ওঠেনি। পৃথিবী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত না পড়লেও একনজরে দেখে নিলাম। সভ্যতার শুরু, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শনের সব গুরুজনদের ছবিসহ সংরক্ষিত আছে। গ্যালারিতে পৃথিবীর বিশাল একটি মানচিত্র আছে। অনেক পুরনো মানচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক মানচিত্র সংরক্ষিত আছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



