সচিবালয় বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের ওপর চপেটাঘাত : জামায়াত

Printed Edition
জামায়াতের প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির : নয়া দিগন্ত
জামায়াতের প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার দিনটিকে কালো দিন উল্লেখ করে জামায়াত নেতারা বলেছেন, বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর মূলত একটি চপেটাঘাত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ট্রাস্ট ও কনফিডেন্স তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। জনগণের আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করা হয়েছে। একইসাথে এই কাজের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। যাকে আমরা বলতে পারি This is a black day for the independence of judiciary

বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার জন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে আমাদের বিচার বিভাগ সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। অবশেষে ১৯৯৯ সালে মাজদার হোসেন মামলার মাধ্যমে উচ্চ আদালত ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেন। সেই নির্দেশনার আলোকে ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে পৃথক করা হয়।

তিনি বলেন, একইসাথে বিচারকদের নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন (বিজেএস) প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তাদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে আমাদের দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের ভিত্তিতে হাইকোর্ট বিভাগ রায় প্রদান করেন। ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর সেই রায়ে বলা হয়, ৯০ দিনের মধ্যে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর আলোকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে এবং পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়। এ বছরের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের বিস্তারিত রায় প্রকাশিত হলে ১০ এপ্রিল সরকার সেই বিচার বিভাগীয় অধ্যাদেশ বাতিল ঘোষণা করে।

অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, সরকারের সেই সিদ্ধান্তের প্রেেিত আমরা ১৯ এপ্রিল আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করি। রিটটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ৫ মে আমরা আদালত অবমাননার নোটিশ জারি করি। এরপর ১৯ মে বিচার বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। অর্থাৎ বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে আবারো পেরেক ঠুকে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, এই প্রোপটে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই বিচারিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বিচার বিভাগের দু’টি অংশ রয়েছে- উচ্চ আদালত ও নিম্নœ আদালত। উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের েেত্র সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। আর নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ একসময় বিসিএস পরীার মাধ্যমে হতো। পরে সেখান থেকে আলাদা করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) নামে একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা চালু করা হয়। আপিল বিভাগের একজন বিচারকের নেতৃত্বে এ কাজটি করা হয়ে থাকে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটা স্বচ্ছভাবে মানা হয়। কিন্তু তাদের ছুটি, তাদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার সবগুলো ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। ফলশ্রুতিতে, আইন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচারকরা কোনো আদেশ দিলে তাদের বদলি করে দেন, পদোন্নতি দেন না কিংবা শৃঙ্খলাজনিত অভিযোগ আনা হয়।

শিশির মনির আরো বলেন, এই সমস্যা সমাধানের জন্য এবারই প্রথম তাদের ছুটি, তাদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার এই চারটি কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রধান বিচারপতির অধীনে একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এখানে ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে নিয়োগও দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, আমাদের বিবেচনায় বিচার বিভাগ স্বাধীন হলে রায় যার পইে যাক না কেন তাতে কোনো আপত্তি নেই। সঠিক বিচারের মাধ্যমে আমাদের আসামি হিসেবে আদালতে দাঁড়াতে হলেও আপত্তি নেই। বিচার বিভাগকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে সভ্য সমাজ গড়ে উঠতে পারে না।

তিনি বলেন, সরকার যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যা সংবিধান ও আইনসম্মত নয়- বিচারকরা সেটি দেখবেন ও রায় দেবেন। আমি রায়ে অসন্তুষ্ট হলে আপিল করব। কিন্তু বিচারকদের বদলি করে দেবো, তাদের পদোন্নতি দেবো না, তাদের সুন্দরবন-বান্দরবান বদলি করে দেবো- এটি স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্র হতে পারে না।

শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সর্বদাই স্বাধীন বিচার বিভাগের প।ে স্বাধীনভাবে বিচারকরা বিচারকার্য পরিচালনা করবেন- তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নাই। আমরা মনে করি, বদলি, ছুটি পদোন্নতি আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকা উচিত নয়, সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকা উচিত। এটি লঙ্ঘন করা হলে অধস্তন আদালতের বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। রাতে কিংবা সন্ধ্যায় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে সাজা দেয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে, তবেই আইন মন্ত্রণালয় এটি চাইবে। আর যদি এই অভিপ্রায় না থাকে- তাহলে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে আইন মন্ত্রণালয় ও সরকারের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়।

তিনি বলেন, আদালতে সরকারের বিরুদ্ধে আদেশ হলে সরকার আপিল করবে, বিচারককে বদলি করবে কেন? পদোন্নতি দেবে না কেন? পদোন্নতির সময় হলে তিনি পদোন্নতি পাবেন। তিনি অপরাধী না হলে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করলে তিনি আইন অনুযায়ী কাজ করবেন।

বিচারকদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পছন্দসই রায় না হলে তাদের ওপর চড়াও হওয়ার জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে দিচ্ছেন- এটির নাম হচ্ছে সচিবালয়। অর্থাৎ বদলি, পদোন্নতি, ছুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সচিবালয় এবং শৃঙ্খলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আইন মন্ত্রণালয়। এই আইন মন্ত্রণালয়ের করায়ত্ত থেকে স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিশেষ কমিটির আলোকে এই বিধানটি করা হয়েছিল।

শিশির মনির বলেন, প্রধান বিচারপতিকে স্বাধীনভাবে ৫০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের যে মতা দেয়া হয়েছিল সেই আইনটি তারা বাতিল করেছেন। এই মতাও কেড়ে নেয়া হয়েছে। অধস্তন দুই হাজার বিচারক তাদের কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশে প্রতি ৭৮ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন বিচারক রয়েছে, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সুপ্রিম কোর্ট এই ৭৮ হাজার মানুষের জন্য বিচারক বৃদ্ধির পদপে নিয়েছিলেন- এই মতাও কেড়ে নেয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এখন ইচ্ছা করলে নিয়োগ দেবে বা সংখ্যা বাড়াবে বা কমাবে। প্রধান বিচারপতির আর কোনো এখতিয়ার নেই। আমরা মনে করি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় পুনর্বহাল করা অত্যন্ত জরুরি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর সহাকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।

কালবেলায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ : গতকাল দৈনিক কালবেলায় ‘জামায়াত আমিরের জালিয়াত উপদেষ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও শিষ্টাচারবহির্ভূত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, দৈনিক কালবেলায় ‘জামায়াত আমিরের জালিয়াত উপদেষ্টা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও শিষ্টাচার বহির্ভূত। কারণ যে ব্যক্তিকে নিয়ে সংবাদ সাজানো হয়েছে, তার সাথে জামায়াতের বর্তমানে কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও তাকে সামনে এনে কালবেলার এমন সংবাদ প্রকাশ করায় আমি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, প্রকৃতপে সংবাদের ভেতরে উপস্থাপিত বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততা উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু তারপরও শিরোনামটি করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীকে ঘায়েল করা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। প্রকৃতপ,ে ওই ব্যক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো পর্যায়ের কর্মী বা নেতা ছিলেন না। তিনি বর্তমানে জামায়াত আমিরের উপদেষ্টাও নন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাকে উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তার অতীত ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্ততা ছিল না বা এখনো নেই। প্রতিবেদনেও এর কোনো উল্লেখ নেই। তা সত্ত্বেও ‘জামায়াত আমিরের জালিয়াত উপদেষ্টা’ শিরোনাম করা জামায়াতের প্রতি কোনো কোনো মহলের বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ। একটি জাতীয় দৈনিকে এমন সংবাদ প্রকাশ নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় ও সাংবাদিকতার নীতিবিরোধী।

অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, আমিরে জামায়াতের বর্তমান পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম আরমান এমপি। ভবিষ্যতে সতর্কতার সাথে সঠিক তথ্য সম্বলিত খবর প্রকাশ নিশ্চিত করা এবং কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে কালবেলা কর্তৃপরে প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।