অর্ধেক জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলীন

দখল, দূষণ ও পরিকল্পনাহীন নগরায়নে বাড়ছে পরিবেশগত ঝুঁকি

Printed Edition

আবুল কালাম

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে নদী, খাল, বিল, হাওর ও জলাভূমিসহ দেশের প্রায় অর্ধেক জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে। পানিপ্রবাহ সঙ্কুচিত হওয়ায় বেড়েছে বন্যা ও জলাবদ্ধতা, কমেছে জীববৈচিত্র্য ও মাছ উৎপাদন। একই সাথে কৃষি সেচে সঙ্কট এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট দফতরের তথ্য বিশ্লেষণে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখল, শিল্পবর্জ্য ও দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিয়মিত খননের অভাবে দেশের জলাশয় দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। জলাশয় রক্ষায় বিদ্যমান আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ না হওয়া এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

নদীপথ কমেছে, মৃতপ্রায় শত শত নদী

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে একসময় প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল ছিল। বর্তমানে এর বড় অংশ নাব্যতা হারিয়েছে। বিভিন্ন নদী গবেষণা সংস্থার হিসাবে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ নদী কোনো না কোনোভাবে দূষণ, দখল বা পলি জমে সঙ্কটে রয়েছে।

নদী গবেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর দেশে প্রায় এক হাজারের বেশি নদী থাকলেও এখন অনেক নদী মৌসুমি খালে পরিণত হয়েছে। শুকনো মৌসুমে বহু নদীতে পানিপ্রবাহ থাকে না। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, কর্ণফুলী ও রূপসার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো মারাত্মক দূষণের শিকার।

জলাশয় ও কৃষিজমি কমছে দ্রুত

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, নদী, খাল, বিল, হাওর ও প্লাবনভূমিসহ দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন হেক্টর। অন্যদিকে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, ছোট-বড় মিলিয়ে দেশে প্রায় ১০ লাখের বেশি জলাশয় ছিল, যার প্রায় অর্ধেক বিভিন্ন ভাবে বিলীন বা দখল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক দশকে দেশে প্রায় ২১ শতাংশ চাষযোগ্য জমি কমেছে। হাওরাঞ্চলের আয়তন কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং চারণভূমি ও বনভূমি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা, মার্কেট, ইটভাটা, সড়ক ও বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা কমছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

ঢাকায় হারিয়ে যাচ্ছে খাল

রাজধানী ঢাকার জলাশয় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একসময় ঢাকায় দুই শতাধিক খাল ও জলাশয় ছিল। বর্তমানে এর বড় অংশ ভরাট হয়ে গেছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৬৫টি খালের অস্তিত্ব রয়েছে। অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) ম্যাপে প্রায় ২১৯টি খালের চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে বাস্তবে এসব খালের বড় অংশ দখল ও ভরাট হয়ে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন কোম্পানি, ডেভেলপার, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অবৈধ দখলদারদের কারণে ঢাকার খালগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে খালের ওপর স্থাপনা, সড়ক, মার্কেট ও বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে।

বিভাগভিত্তিক সঙ্কট

সংশ্লিষ্ট দফতর ও স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ জলাশয় বিলীন, দখল বা ভরাট হয়ে গেছে।

বরিশাল বিভাগে প্রায় ১৫ হাজার জলাশয়ের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ অস্তিত্ব হারিয়েছে। অবৈধ দখল, নদীভাঙন, পলি জমা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রংপুর বিভাগে এক সময় আট থেকে ১২ হাজার জলাশয় থাকলেও পুকুর ভরাট, খাল সঙ্কুচিত হওয়া, বিল শুকিয়ে যাওয়া এবং কৃষিজমিতে রূপান্তরের কারণে প্রায় অর্ধেক জলাশয় হারিয়ে গেছে।

খুলনা বিভাগে প্রায় এক লাখ জলাশয়ের মধ্যে ৪৫ শতাংশ অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে। রাজশাহী বিভাগেও একই অবস্থা। সেখানে প্রায় অর্ধেক জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৫ শতাংশ।

দখলদারদের তালিকা, চলছে উচ্ছেদ অভিযান

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নদী-খাল দখল করেছে। কমিশন ইতোমধ্যে বহু দখলদারের তালিকা তৈরি করেছে এবং উচ্ছেদকার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সারা দেশে নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। হাজার হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জলাশয়ের জমি উদ্ধার করা হয়েছে। ছোট নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।’

তিনি আরো জানান, জলাভূমি ও হাওর রক্ষায় নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। অবৈধ দখল বা ভরাটের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার বিধানও রয়েছে।

‘আইন আছে, প্রয়োগ নেই’

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, নদী ও জলাধার সঙ্কুচিত হওয়া এবং পানির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বহু নদী কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্বকালে প্রায় ৬৫ হাজার নদী দখলদারের তালিকা করা হয়েছিল। ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৩ শতাংশ দখলদার উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি।’

তার ভাষ্য, ‘জলাধার রক্ষায় দেশে যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু যারা আইন প্রয়োগ করবেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়েন। সরকারের আন্তরিকতা ও কঠোর বাস্তবায়ন ছাড়া নদী ও জলাশয় রক্ষা সম্ভব নয়।’

পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, জলাশয় ধ্বংসের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ভয়াবহ পানিসঙ্কট, তীব্র জলাবদ্ধতা, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তাই নদী ও জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই।