মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার শঙ্কায় বাড়ছে বিক্রয়চাপ

মন্দা বাজারেও মিউচুয়াল ফান্ডের রমরমা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আস্থার সঙ্কট থেকে বেরিয়ে সাবলীল আচরণে ফেরার মুহূর্তে ফের নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হচ্ছে পুঁজিবাজার। অনেকটা থেমে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ ওই সময় বিশে^র সবগুলো পুঁজিবাজারকে ধারাবাহিক পতনের দিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলে পুনরায় পতনের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে বাজার। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে নানা ইস্যুতে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফলে প্রায় প্রতিদিনই হামলা ও পাল্টা হামলা চলতে থাকে যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। তারা মনে করেন, আবার দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে পড়ার শঙ্কা থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে বিক্রয়চাপ।

গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারে সবগুলো সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৭ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৮৯৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৮৯৮ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩৪ ও ৪ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট। অনুরূভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৫২ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট হারায়। ১৫ হাজার ৭৯৮ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি লেনদেন শেষে ১৫ হাজার ৭৭৩ দশমিক ৩০ পয়েন্টে স্থির হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ০৯ ও ২২ দশমিক ৭৩ পয়েন্টে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পুনরায় দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়ার শঙ্কা থেকে বাড়ছে বিক্রয়চাপ। এ পর্যায়ে বিনিয়োগকারীরা যে যার অবস্থান থেকে মুনাফা তুলে নেয়ার তাগিদ অনুভব করছেন। এর আগে একই যুদ্ধের প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কবলে আটকা ছিল পুঁজিবাজার। তাই নতুন করে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ বিশে^র অর্থনীতিকে টালমাটাল করে তুলতে পারে। আর এর বড় প্রভাব থাকবে পুঁজিবাজারে। অতি সম্প্রতি ভালো অবস্থানের দিকে ফিরতে থাকা পুঁজিবাজারও এর বাইরে থাকবে না। তাই নিজেদের সুরক্ষিত রাখতেই এ বিক্রয়চাপ।

সূচকের অবনতি সত্ত্বেও গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটেছে। ঢাকা স্টকে গতকাল এক হাজার ২১১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৮২ কোটি টাকা বেশি। মঙ্গলবার ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল এক হাজার ১২৯ কোটি টাকা। লেনদেন সামান্য বেড়েছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারেও। গতকাল এখানে ১৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়। আগের দিন বাজারটির রলনদেন ছিল ১৪ কোটি টাকা।

এ দিকে মন্দা বাজারেও মিউচুয়াল ফান্ডের রমরমা ব্যবসা চলছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বাইরে থাকা এ খাতটির মূল্যস্তর গত কয়েক দিনে বেশ বেড়েছে। গতকালও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে থাকা দশটি সিকিউরিটিজের মধ্যে আটটি ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুনর্গঠিত কমিশন সংস্কারের অংশ হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালায় যে পরিবর্তন আনে তার নেতিবাচক প্রভাব ছিল বাজারে। ফলে ওই সময় বিনিয়োগকারীরা এ খাতটি থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন। ফলে খাতটি ব্যাপকভাবে দরপতনের শিকার হয়। বাজারে থাকা ৩৮টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৫টি বাদ দিয়ে বাকিগুলোর দর ছিল অভিহিত মূল্যের অনেক নিচে। তবে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর সংস্থাটির চেয়ারম্যান বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মিউচুয়াল ফান্ডের উপযোগিতা নিয়ে কথা বলেন। একই সাথে তিনি এ খাতটিকে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অঙ্গীকার করেন, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ আবার এ খাতে ফিরে আসে, যা খাতটির মূল্যস্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়।

গতকাল ঢাকা স্টকে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে আইটি কনসালট্যান্ট লি:। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এ প্রতিষ্ঠানটির ৯৮ লাখ ৮৮ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়, যার মূল্য ছিল ৫২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২২ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় ৪৬ লাখ ৪১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের টেকনোড্রাগস লিমিটেড। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, ফু ওয়াং সিরামিকস, স্যালভো কেমিক্যালস, সিটি ব্যাংক, মালেক স্পিনিং মিলস, লঙ্কা বাংলা ফিন্যান্স, সায়হাম কটন মিলস ও ইন্দো বাংলা ফার্মা।

গতকাল বুধবার ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ফান্ডটির। ৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। দরবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম আইসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এফবিএসএল গ্রোথ ফান্ড, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, ইবিএল এনআরবি ও পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।

গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল প্রিমিয়ার ব্যাংক। কোম্পানিটি গতকাল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ দর হারায়। ৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, ঝিল বাংলা সুগার মিলস, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স, তাক্বাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ও শ্যামপুর সুগার মিলস।