তাগুতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট

Printed Edition
তাগুতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট
তাগুতের অনুসারীরা পথভ্রষ্ট

জাফর আহমাদ

আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাঁর মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি, আল্লাহর বন্দেগি করো এবং তাগুতের বন্দেগি পরিহার করো। এরপর তাদের মধ্য থেকে কাউকে আল্লাহ সঠিক পথের সন্ধান দিয়েছেন এবং কারো ওপর পথভ্রষ্টতা চেপে বসেছে। তারপর পৃথিবীর বুকে একটু ঘোরাফেরা করে দেখে নাও যারা সত্যকে মিথ্যা বলেছে তাদের পরিণাম কী হয়েছে’ (সূরা নাহল-৩৬)।

তাগুত শব্দটি তগা বা তাগাউন মূল শব্দ থেকে নির্গত। এর শাব্দিক অর্থ হলো- সীমা অতিক্রম করা, ভাবার্থে অত্যাচার করা।

আভিধানিক অর্থে এমন ব্যক্তিকে তাগুত বলা হবে, যে নিজের বৈধ অধিকারের সীমানা লঙ্ঘন করে। কুরআনের পরিভাষায় তাগুত এমন এক বান্দাকে বলা হয়, যে বন্দেগি ও দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে নিজেই প্রভু ও খোদা হওয়ার দাবিদার সাজে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে নিজের বন্দেগি ও দাসত্বে নিযুক্ত করে। আল্লাহর মোকাবেলায় বান্দার প্রভুত্বের দাবিদার সাজা এবং বিদ্রোহ করার তিনটি পর্যায় আছে। প্রথম পর্যায়ে বান্দা নীতিগতভাবে তার শাসন কর্তৃত্বকে সত্য বলে মেনে নেয় কিন্তু কার্যত তার বিধানের বিরুদ্ধাচরণ করে। একে বলা হয় ফাসেকি। দ্বিতীয় পর্যায়ে সে আল্লাহর শান কর্তৃত্বকে নীতিগতভাবে মেনে না নিয়ে নিজের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় অথবা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো বন্দেগি ও দাসত্ব করতে থাকে। একে বলা হয় কুফরি। তৃতীয় পর্যায়ে সে মালিক ও প্রভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তার রাজ্যে এবং প্রজাদের মধ্যে নিজের হুকুম চালাতে থাকে। যেমন ফেরাউন একজন তাগুত ছিল। এই শেষ পর্যায়ে যে বান্দা পৌঁছে যায় তাকেই বলা হয় তাগুত। কোনো ব্যক্তি এই তাগুতকে অস্বীকার না করা পর্যন্ত সঠিক অর্থে আল্লাহর মুমিন বান্দা হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথ থেকে সঠিক মত ও পথকে আলাদা করে দেয়া হয়েছে। এখন যে কেউ তাগুতকে অস্বীকার করে আল্লাহর ওপর ঈমান আনে সে এমন একটি মজবুত অবলম্বন আঁকড়ে ধরে, যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ শোনেন ও জানেন’ (সূরা বাকারা-২৫৬)।

তাগুতের অনুসারী আল্লাহর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটি তাগুতের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয় না; বরং তাগুত তার ওপর ঝেঁকে বসে। প্রধান তাগুত শয়তান এই সব ব্যক্তিদের সামনে প্রতিদিন নতুন নতুন আকাশ-কুসুম স্বপ্ন রচনা করে তাদেরকে মিথ্যা প্রলোভনে প্রলুব্ধ করে রাখে। দ্বিতীয়, তাগুত হচ্ছে মানুষের নফস। এই নফস তাকে আবেগ ও লালসার দাস বানিয়ে জীবনের আঁকাবাঁকা পথে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। এ ছাড়া বাইরের জগতে আরো অসংখ্য তাগুত ছড়িয়ে রয়েছে। স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন, পরিবার, বংশ, গোত্র, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজন, সমাজ, জাতি, নেতা, রাষ্ট্র, দেশ, শাসক ইত্যাদি সব কিছুই মানুষের জন্য মূর্তিমান তাগুত হতে পারে যদি আল্লাহর নাফরমানি করে। এদের প্রত্যেকেই তাকে নিজের স্বার্থের দাস হিসেবে ব্যবহার করে। মানুষ তার এই অসংখ্য প্রভুর দাসত্ব করতে করতে এবং এদের মধ্য থেকে কাকে সন্তুষ্ট করবে আর কার অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করবে এই ফিকিরের চক্করে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। তাগুতের অনুসারীদের পরিচয় আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন- ‘তুমি তাদেরকে দেখনি, যাদেরকে কিতাবের জ্ঞান থেকে কিছু অংশ দেয়া হয়েছে এবং তাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা জিবত ও তাগুতকে মানে আর কাফেরদের সম্পর্কে বলে, ঈমানদারদের তুলনায় এরাই তো অধিকতর নির্ভুল পথে চলছে’ (সূরা নিসা-৫১)?

ইবনে কাইয়েম রহ: পাঁচটি মূল তাগুতের কথা উল্লেখ করেছেন। ১. শয়তান : মহান আল্লাহ থেকে বিতাড়িত বা অভিশপ্ত শয়তান হলো, মানুষের জন্য প্রধান তাগুত। সে মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে আহ্বান জানায়। সে মানুষকে আলোর পথ থেকে সরিয়ে এনে অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। অবিশ্বাস, নাস্তিকতার মাধ্যমে তাকে জাহান্নামের অধিকারী বানায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের সাহায্যকারী ও সহায়। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করে তাদের সাহায্যকারী ও সহায় হচ্ছে তাগুত। সে তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। এরা আগুনের অধিকারী। সেখানে থাকবে এরা চিরকালের জন্য’ (সূরা বাকারা-২৫৭)।

২. যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করে এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকে আর যার ইবাদত করে সেও সন্তুষ্ট হয়। লোকেরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত করে, সে একজন তাগুত।

৩. যে ব্যক্তি দাবি করে যে, তার অদৃশ্যের জ্ঞান আছে, সেও একজন তাগুত। কারণ সে আল্লাহর জ্ঞানে ভাগ বসায়। আল্লাহু আল্লামুল গুয়ুব, আল্লাহ ব্যতীত কেউ অদুশ্যের জ্ঞান রাখে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তাদেরকে বলো, আল্লাহ ছাড়া পৃথিবী ও আকাশে কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না এবং তারা জানে না কবে তাদেরকে উঠিয়ে নেয়া হবে’ (সূরা নামল-৬৫)। সুতরাং যারা কোনো ব্যক্তিকে অদৃশ্যের জ্ঞান আছে বলে বিশ^াস করে, কিন্তু সেই ব্যক্তি কখনো বলে যায়নি যে, আমার কাছে অদৃশ্যের জ্ঞান আছে। তবে অনুসারীরাই তাগুত বলে বিবেচিত হবে।

৪. যে মানুষকে নিজের ইবাদতের জন্য ডাকে। এটি কিছু সুুফি সাধকের অনুসারী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তি করে যারা আল্লাহর বান্দাদের নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজেদেরকে দেবত্বের মর্যাদা দেয়। যারা মানুষকে এ ধারণা দেয়, তারা লাভ ও ক্ষতি উভয় করতে পারে, তারাই তাগুত।

৫. যে ব্যক্তি সর্বশক্তিমান আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা শাসন পরিচালনা করে, সে একজন তাগুত। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘হে নবী! তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা এই মর্মে দাবি করে চলেছে যে, তারা ঈমান এনেছে সেই কিতাবের প্রতি যা তোমার ওপর নাজিল করা হয়েছে এবং এই সব কিতাবের প্রতি যেগুলো তোমার পূর্বে নাজিল করা হয়েছিল কিন্তু তারা নিজেদের বিষয়গুলো ফয়সালা করার জন্য তাগুতের দিকে ফিরতে চায়, অথচ তাদেরকে তাগুত অস্বীকার করার হুকুম দেয়া হয়েছিল? শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সরল সোজা পথ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চায়’ (সূরা নিসা-৬০)।

এখানে তাগুত বলতে সুস্পষ্টভাবে এমন শাসককে বোঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোনো আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে এবং এমন বিচার ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে যা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার আনুগত্য করে না এবং আল্লাহর কিতাবকে চূড়ান্ত সনদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। কাজেই যে আদালত তাগুতের ভূমিকা পালন করছে, নিজের বিভিন্ন বিষয়ের ফয়সালার জন্য তার কাছে উপস্থিত হওয়া যে একটি ঈমানবিরোধী কাজ, এ ব্যাপারে আয়াতটির বক্তব্য সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। আর আল্লাহ ও তাঁর কিতাবের প্রতি ঈমান আনার অপরিহার্য দাবি অনুযাযী এ ধরনের আদালতকে বৈধ আদালত হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানানোই প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য। কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা, এ দু’টি বিষয় পরস্পরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে সংযুক্ত এবং এদের একটি অন্যটির অনিবার্য পরিণতি। আল্লাহ ও তাগুত উভয়ের সামনে একই সাথে মাথা নত করাই হচ্ছে সুস্পষ্ট মুনাফেকি। আল কুরআনে বলা হয়েছে- ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না তারা কাফের’ (সূরা মায়েদা-৪৪)। একই সূরার ৪৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তারা জালিম’ এবং ৪৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তারা ফাসিক’। সুতরাং যারা তাগুত তারাই কাফের, জালিম ও ফাসিক।

সুতরাং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার প্রধান দাবি হলো- তাঁর নাজিলকৃত কিতাব অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা ও শাসনকার্য পরিচালনা করতে হবে এবং পুরো জীবনব্যবস্থায় তাগুতকে অস্বীকার করতে হবে।

উল্লিখিত আলোচনা ও আল কুরআনের আয়াতের আলোকে যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিল করা কিতাব বা আইন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা বা শাসনকার্য পরিচালনা না করে; বরং মানুষের তৈরি আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে সে-ই প্রকৃত তাগুত। পক্ষান্তরে যারা সন্তুষ্টচিত্তে সেই সব বিচার-ফয়সালা ও শাসনকার্য মেনে নেবে তারা তাগুতের অনুসারী। ফেরাউন নিজেকে ‘আনা রাব্বুকুমুল আলা’ ‘আমি তোমাদের সর্বোচ্চ রব’ দাবি করেছিল। ফলে ফিরাউন তাগুত আর যারা তার এ দাবি মেনে নিয়েছিল, তারা তাগুতের অনুসারী। আল্লাহ তায়ালা মূসা আ:-কে নির্দেশ দিলেন, ‘ফেরাউনের কাছে যাও, সে তাগুত হয়ে গেছে।’ সুতরাং কোনো শাসক যদি মানুষের তৈরি আইনকানুন দিয়ে দেশ পরিচালনা করে তবে তাগুতের অনুসারীর তকমা থেকে নিজেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য অবশ্যই এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধনে নিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

লেখক : প্রবন্ধকার ও গবেষক