বিশ্বমঞ্চে টাইগ্রেসরা : স্বপ্ন, সংগ্রাম আর নতুন অভিযাত্রা

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপযাত্রা নিছক কোনো ক্রীড়া অধ্যায়ের গল্প নয়, এটি এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, অবহেলা আর প্রতিকূলতাকে জয় করার কাহিনী। ক্রিকেটবিশ্বে বাংলাদেশের পুরুষ দলের অর্জন নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, নারী ক্রিকেটের গল্প ততটা আলোচনায় আসে না। অথচ সীমিত সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের মেয়েরা এক অনন্য দৃঢ়তা নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

এবার ইংল্যান্ডের মাটিতে বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল শুধু একটি টুর্নামেন্ট খেলতে যায়নি, তারা সাথে করে নিয়ে গেছে একটি জাতির প্রত্যাশা, বহু বছরের পরিশ্রম এবং নতুন স্বপ্নের বার্তা। অতীতের অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা এবং সাম্প্রতিক উন্নতির ধারাবাহিকতায় এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের জন্য হতে পারে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচনের মঞ্চ।

সালমা খাতুন, জাহানারা আলম থেকে শুরু করে বর্তমানের নিগার সুলতানা জ্যোতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারী ক্রিকেটাররা ক্রিকেট পিচকে বানিয়েছেন নিজেদের স্বপ্নজয়ের ক্যানভাস। ওয়ানডে এবং টি-২০ দুই ফরম্যাটের বিশ্বকাপেই এখন নিয়মিত মুখ আমাদের টাইগ্রেসরা। ওয়ানডে বিশ্বকাপে রাজকীয় অভিষেক ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে খেলার মিশন। অবশেষে ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নাম লেখায় বাংলাদেশ। নিজেদের প্রথম আসরেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৯ রানে হারিয়ে ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নেয় টাইগ্রেসরা। বিশ্বমঞ্চে সেটিই ছিল বড় ফরম্যাটে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। এরপর দল ২০২৩-২০২৫ আইসিসি উইমেনস চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসেবে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে ২০২৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও নিজেদের জায়গা পাকা করে।

শুরুটা ছিল কঠিন, পথটা ছিল আরো কঠোর

বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় এমন এক সময়ে, যখন মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে সমাজে ছিল নানা সঙ্কীর্ণতা। ক্রিকেট খেলাকে অনেকেই মেয়েদের জন্য উপযুক্ত মনে করতেন না। পরিবারের সমর্থন পাওয়া ছিল কঠিন, মাঠ-সুবিধা ছিল সীমিত, আর প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল অপ্রতুল। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সহযোগী সদস্য দেশের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম আলোচনায় আসে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের জায়গা করে নেয়ার জন্য তখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হতো।

ধীরে ধীরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নারী ক্রিকেটে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে। গড়ে ওঠে বয়সভিত্তিক দল, শুরু হয় নিয়মিত ক্যাম্প, বাড়ে প্রতিযোগিতার সংখ্যা। সালমা খাতুন, রুমানা আহমেদ, জাহানারা আলমদের মতো পথিকৃৎ ক্রিকেটাররা শুধু মাঠে পারফর্ম করেননি, তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথও তৈরি করেছেন। তাদের সংগ্রামই আজকের বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ভিত।

টি-২০ বিশ্বকাপ

২০১৪ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল প্রথমবার অংশ নেয়। সেই থেকে শুরু করে ২০১৬, ২০১৮, ২০২০, ২০২৩ এবং ২০২৪ প্রতিটি আসরেই নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে খেলেছে টাইগ্রেসরা। ২০২৪ সালের বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের জয়খরা কাটানো ছিল দলটির জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ব্রেক-থ্রু। ২০২৬ সালের ইংল্যান্ড ও ওয়েলস বিশ্বকাপেও জ্যোতিরা খেলতে নামছেন সেরা পারফরম্যান্সের লক্ষ্য নিয়ে।

টাইগ্রেসরা একাধিক স্মরণীয় মুহূর্ত

প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপে (২০২২) নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম জয়। ২০১৪ সালে টি-২০ আয়োজক দেশ হিসেবে প্রথম অংশগ্রহণ। বাছাইপর্বে ২০২২ ও ২০২৬ সালের গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূল আসরে কোয়ালিফাই করার গৌরব।

বিশ্বকাপে প্রথম পদচারণা

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপে অভিষেক ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে তারা বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নেয়। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে অভিজ্ঞতার ঘাটতি, চাপ সামলানোর সীমাবদ্ধতা এবং বড় দলগুলোর বিপক্ষে মানসিক প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট ছিল। প্রথম কয়েকটি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফল আশানুরূপ হয়নি। বেশির ভাগ ম্যাচেই পরাজয় সাথী হয়েছে। ব্যাটিং ব্যর্থতা, মাঝেমধ্যে বোলিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব এবং ফিল্ডিংয়ে ছোট ছোট ভুল বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।

তবে ফলাফল দিয়ে বাংলাদেশের নারী দলের পারফরম্যান্স পুরোপুরি বিচার করা অন্যায় হবে। কারণ প্রতিটি বিশ্বকাপই তাদের জন্য ছিল শেখার একেকটি ধাপ। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা দলকে মানসিকভাবে আরো শক্তিশালী করেছে।

২০১৮ এশিয়া কাপ : বদলে যাওয়ার সূচনা

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০১৮ সালে। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত নারী এশিয়া কাপে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে চমকে দেয়। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জয়ের সেই মুহূর্ত শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প ছিল না, সেটি ছিল বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা।

সেই সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে বাংলাদেশের মেয়েরাও বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। এই অর্জনের পর নারী ক্রিকেটে আগ্রহ বাড়ে, নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়, বোর্ডও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করে।

নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাস

বর্তমান বাংলাদেশ নারী দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। এক দিকে আছেন অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা, অন্য দিকে উঠে আসছেন নতুন মুখ। নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্বে দলটি এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে তার ধারাবাহিকতা দলের অন্যতম শক্তি। এ ছাড়া ফাহিমা খাতুন, মারুফা আক্তার, রিতু মনি, শারমিন আক্তারদের মতো ক্রিকেটাররা দলে ভারসাম্য এনে দিয়েছেন।

অনূর্ধ্ব-১৯ নারী দলের সাম্প্রতিক সাফল্য এবং মারুফা আক্তার, স্বর্ণা আক্তারের মতো তরুণ প্রতিভাদের উত্থান প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। মাঠের লড়াইয়ে নিগার সুলতানা জ্যোতির নেতৃত্ব এবং নাহিদা আক্তারের স্পিন জাদু এখন যেকোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জন্যই ভয়ের কারণ। বিশেষ করে পেস বোলিং বিভাগে উন্নতি চোখে পড়ার মতো। আগে যেখানে বাংলাদেশ মূলত স্পিননির্ভর ছিল, এখন তরুণ পেসারদের উত্থান দলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে, বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট আর শুধুই অংশগ্রহণের জন্য বিশ্বকাপে যায় না, তারা এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে।

কেন এবার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ

ইংল্যান্ডের মাটিতে এবারের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে এসেছে। প্রথমত, দলের প্রস্তুতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি পরিকল্পিত। বিদেশের কন্ডিশনে খেলার অভিজ্ঞতা, প্রস্তুতি ম্যাচ এবং উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

দ্বিতীয়ত, দলের মানসিকতা বদলেছে। আগে যেখানে বড় দলের বিপক্ষে নামার আগেই এক ধরনের আত্মসমর্পণ কাজ করত, এখন সেখানে লড়াইয়ের মানসিকতা স্পষ্ট।

তৃতীয়ত, বিশ্ব ক্রিকেটে নারী দলের প্রতিযোগিতার ব্যবধান কিছুটা কমেছে। সঠিক দিনে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারলে যেকোনো দলই চমক দেখাতে পারে। বাংলাদেশের শক্তি হতে পারে তাদের শৃঙ্খলিত বোলিং, ধৈর্যশীল ব্যাটিং এবং দলগত পারফরম্যান্স।

চ্যালেঞ্জও কম নয়

স্বপ্নের পাশাপাশি বাস্তবতাও আছে। ইংল্যান্ডের কন্ডিশন বাংলাদেশের জন্য কঠিন হতে পারে। সুইং ও সিমিং উইকেটে ব্যাটারদের টিকে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ ছাড়া বড় মঞ্চের চাপ সামলানোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা অত্যন্ত প্রয়োজন। ব্যাটিংয়ে দ্রুত রান তোলার সক্ষমতা, মিডল অর্ডারের স্থিরতা এবং ফিল্ডিংয়ের ধারাবাহিকতা এই তিন জায়গায় উন্নতি করতে পারলে বাংলাদেশ ভালো কিছু করতে পারে।

বিশ্বকাপ শুধু ক্রিকেট নয়, একটি বার্তাও

বাংলাদেশ নারী দলের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের তাৎপর্য শুধু মাঠের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের অসংখ্য কিশোরীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ছোট শহর বা গ্রামের কোনো মেয়েও এখন স্বপ্ন দেখতে পারে এক দিন সে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলবে। নারী ক্রিকেটের প্রতিটি সাফল্য সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি প্রমাণ করে, সুযোগ আর সমর্থন পেলে মেয়েরাও বিশ্বমঞ্চে দেশের পতাকা উড়াতে পারে।

এবার লক্ষ্য ইতিহাস গড়া

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল অতীতে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে, ব্যর্থতা দেখেছে। কিন্তু এবার তাদের সামনে সুযোগ রয়েছে নতুন ইতিহাস লেখার। হয়তো শিরোপা জয়ের কথা এখনই ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু নকআউট পর্বে যাওয়া, শক্তিশালী দলকে হারানো কিংবা নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স তুলে ধরা এসবই হতে পারে বড় অর্জন।

সবচেয়ে বড় কথা, এবারের বিশ্বকাপ হতে পারে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের নতুন আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি। ইংল্যান্ডের মাঠে যখন বাংলাদেশের মেয়েরা লাল-সবুজের জার্সি গায়ে নামবে, তখন তাদের সঙ্গে থাকবে কোটি মানুষের স্বপ্ন। তাদের প্রতিটি রান, প্রতিটি উইকেট, প্রতিটি লড়াই হয়ে উঠবে একেকটি অনুপ্রেরণার গল্প।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেটের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কাঁটা পেরিয়ে, বাধা ডিঙিয়ে তারা আজ বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে। এবার সেই মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যরে পূর্ণ প্রকাশ ঘটানোর পালা। স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। আর সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে লাল-সবুজের সাহসী ক্রিকেটকন্যারা।

বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ

১৪ জুন নেদারল্যান্ডস, ১৭ জুন অস্ট্রেলিয়া, ২০ জুন পাকিস্তান, ২৫ জুন ভারত ও ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকা।