গত বিশ্বকাপেই রেকর্ড বুকে চলে গিয়েছিল মরক্কো। তারাই যে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে খেলেছে বিশ্বকাপের সেমিতে। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোরা সেই যাত্রায় তাদের কাছে একে একে ধরাশায়ী হয়েছিল ইউরোপের বাঘা বাঘা দলগুলো। বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় ফুটবলশক্তিকে হারায় তারা। এর আগে ১৯৯৮ সালের আসরে তারা হারিয়েছিল আরেক ইউরোপিয়ান দেশ স্কটল্যান্ডকে। বাকি ছিল ল্যাতিন দেশগুলোর বিপক্ষে তাদের অপরাজিত থাকা। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে গতকাল সে কাজটিই করেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি। তাদের প্রতিরোধের মুখে পয়েন্ট হারাতে বাধ্য হয়েছে ব্রাজিল। এই ম্যাচ দিয়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এ বিশ্বকাপের প্রথম খেলা হলো। আর এতে মরক্কোর সাথে ১-১ ড্র করতে বাধ্য হয় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। তাই এখন প্রশ্ন- পেলে, রোনালদো নাজারিও, রোমারিওদের দেশটি কি এবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরতে পারবে, যেমনটি তারা করেছিল ১৯৯৪ সালে। তবে অতীতের রেকর্ড বলছে শুরুর ম্যাচে হোঁচট খেয়ে কখনই চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি ল্যাতিন আমেরিকার সর্ববৃহৎ দেশটি।
১৯৭০ সালের পর ২৪ বছরের বিরতি দিয়ে এই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিশ্বকাপ জয় করেছিল ব্রাজিলিয়ানরা। এরপর ২০০২ জাপান- কোরিয়া বিশ্বকাপে আবার তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। পরবর্তী ২০ বছর দেখা পায়নি এই শিরোপার। তাই যুক্তরাষ্ট্রের মাটি বলে এবার ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহাদের ঘিরে আশা দেখছিল সবাই। সেই আশা অবশ্য শেষ হয়ে যায়নি। এখনো আরো ম্যাচ বাকি। তবে কার্লো আনচেলোত্তির দল যে হতাশাজনক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে মরক্কোর বিপক্ষে, তাতে কিন্তু এবার ষষ্ঠ শিরোপা পাওয়া নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। আর অতীতের রেকর্ড যদি পিছু নেয়, তাহলে এবারো হতাশা নিয়ে বাড়ি ফেরার বিমানে উঠতে হবে সেলেসাওদের।
সব বিশ্বকাপে অংশ নেয়া একমাত্র দেশ ব্রাজিল। তবে অতীতের যে চিত্র তাতে ব্রাজিল যতবার আসরের প্রথম ম্যাচে ড্র করেছে বা হেরেছে, সেই ক’বার আর বিশ্বসেরা হতে পারেনি। শুরুটা ১৯৩০ সাল দিয়েই। সেবার প্রথম ম্যাচেই তাদের হার। উরুগুয়ের সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে ১-২ গোলে হেরেছিল যুগোস্লাভিয়ার কাছে। এতে সেই আসরের আর পরের রাউন্ডে যাওয়া হয়নি, গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে স্পেনের কাছে ১-৩ গোলে হেরেই ছিটকে পড়তে হয়েছিল ব্রাজিলকে।
১৯৭৪ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করেছিল যুগোস্লাভিয়ার সাথে। এরপর তারা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেও ফাইনালে আর খেলা হয়নি। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও পোল্যান্ডের কাছে তাদের হার।
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে ব্রাজিল প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছিল সুইডেনের সাথে। ফলে সেই আসরেও দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার পরও শিরোপা জেতা হয়নি। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে ড্র করা। এরপর ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে গেলেও বেলজিয়ামের কাছে হারে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। এবার কি ব্রাজিল নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে জিততে না পেরে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার ধারা ভাঙতে পারবে। হেক্সা মিশনে এখন গ্রুপ পর্বে তাদের বাকি দুই ম্যাচ হাইতি ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে।
এবার ব্রাজিলের সাথে ড্র করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে হারের কিঞ্চিৎ বদলাও নিয়েছে মরক্কো। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সেই আসরে মরক্কোকে ৩-০ গোলে পরাজয়ের তেতো স্বাদ দিয়েছিল আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম পাড়ের দেশটি।
গতকাল ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বলতে গেলে ৮০ ভাগই ছিল ব্রাজিলের সমর্থক। মরক্কোর দর্শকদের দেখে মনে হচ্ছিল বিশাল গ্যালারিতে হলুদের মাঝে কয়েক স্থানে লালের ছোপ। তবে ম্যাচ শেষে এই আফ্রিকান দেশটির সমর্থকরাই অপেক্ষাকৃত খুশি মনে মাঠ ছেড়েছে।
২১ মিনিটে দারুণ এক কাউন্টার অ্যাটাক থেকে মরক্কোকে এগিয়ে নেন ইসমাইল সাইবারি। ডাচ ক্লাব পিএসভি আইন্দোহেভেনের এই ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজের লব থেকে বল পান তিনি। এরপর ডিফেন্ডার মার্কুইনহাস ও গাব্রিয়েল মাগালহাসকে গতিতে পেছনে ফেলে আগুয়ান গোলরক্ষক এলিসন বেকারকে বোকা বানান সাইবারি। গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠান তিনি। ৩২ মিনিটে বক্সের কোনা থেকে ডান পায়ের দর্শনীয় বাঁকানো শটে খেলায় সমতা আনেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। এরপর পাকুয়েতার একটি বাইসাইকেল কিক বাম দিকে শরীর ফেলে রুখে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো। এই কিপার আরো দু’বার দলকে রক্ষা করেছেন। আর শেষ দিকে ব্রাজিল অল্পের জন্য হার এড়ায়। এল আইনাউইর দূরপাল্লার শট ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিহত করেন বেকার। ফিরতি বলে চেমসদিনে তালবার শট কোনোমতে বাইরে পাঠান তিনি। ফলে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ের দেখা পেল না মরক্কো। জেনে রাখা ভালো এই মরক্কো কিন্তু সর্বশেষ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ী।



