প্রশাসনিক দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত ব্রি-বারিতে নেতৃত্ব সঙ্কট

কক্ষে কক্ষে তালা, থমকে গবেষণা

Printed Edition

মো: আজিজুল হক গাজীপুর মহানগর

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কৃষি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা দেশের দুই শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বর্তমানে নেতৃত্ব সঙ্কট, প্রশাসনিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সিদ্ধান্তহীনতায় গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চলমান এই টানাপড়েনের আড়ালে নিয়োগ, পদোন্নতি, টেন্ডার, প্রকল্প পরিচালনা এবং প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতির বহু অভিযোগ চাপা পড়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এমন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যখন বলিষ্ঠ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন কেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা, বিভ্রান্তি এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয় পরিবর্তন?

সর্বশেষ ঘটনাপ্রবাহে ব্রিতে দেখা গেছে নজিরবিহীন প্রশাসনিক টানাপড়েন। ৩ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ৪ মে তিনি পুলিশ ও আনসারের নিরাপত্তায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের দিনই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ, অবস্থান, ধাক্কাধাক্কি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটে।

কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার ২৪ ঘণ্টার মাথায়, ৫ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নতুন অফিস আদেশে আগের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) আফসারী খানমকে ব্রির মহাপরিচালকের শূন্য পদের বিপরীতে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। একই আদেশে ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের পরিবর্তে পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

ব্রির একাধিক বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড. আমিনুল ইসলামের দায়িত্ব গ্রহণের দিন সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ছিল প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষণা বিভাগ, ল্যাব, দফতর ও বিজ্ঞানীদের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়া। এতে স্বাভাবিক গবেষণাকার্যক্রম, ল্যাবভিত্তিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ফাইল নিষ্পত্তি এবং দাফতরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেন, ‘আমরা রাজনীতি নয়, গবেষণা করতে চাই। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের দিন কক্ষে কক্ষে তালা ঝুলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, তা শুধু প্রশাসনিক প্রতিবাদ নয়; এটি গবেষণা ও পেশাদার পরিবেশের ওপর সরাসরি আঘাত।’

একাধিক সূত্রের দাবি, দুই থেকে তিনজন প্রভাবশালী বিজ্ঞানীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণের দিন কক্ষে তালা ঝুলানো, কর্মপরিবেশ বিঘিœত করা, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজন তৈরির চেষ্টা হয়েছে।

ব্রির সাধারণ বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশের মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে দলবাজি নয়, পেশাদারিত্বই হওয়া উচিত মূল পরিচয়। তারা বলছেন, ‘নীতিনির্ধারণী মহল যেন কোনো পক্ষের প্ররোচনা, চাপ বা বিভ্রান্তির শিকার না হয়ে প্রকৃত বাস্তবতা, জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা, অতীতের ভূমিকা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ব্রিতে গত কয়েক বছরে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, প্রকল্প পরিচালনা এবং টেন্ডার-প্রক্রিয়া ঘিরে একাধিক অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু নেতৃত্ব সঙ্কট এবং চলমান দ্বন্দ্বের কারণে এসব অভিযোগ কার্যত আড়ালে চলে যাচ্ছে। একই সময়ে পাশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটেও নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আতাউর রহমান চলতি মাসের ২৫ মে অবসরে যাচ্ছেন। কে হচ্ছেন তার উত্তরসূরি, এ প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানজুড়ে চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। বারি সূত্রে জানা গেছে, সাত পরিচালকের মধ্যে তিনজন ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মহাপরিচালককেই অতিরিক্ত দায়িত্বে একাধিক পরিচালকের কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, গবেষণাকার্যক্রম, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং মাঠপর্যায়ের প্রযুক্তি সম্প্রসারণে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কৃষি গবেষণা খাত সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রি ও বারিতে চলমান নেতৃত্ব সঙ্কট শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি গবেষণাব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতিতে বিতর্ক, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, প্রকল্প বণ্টনে পক্ষপাত এবং প্রশাসনিক বলয় তৈরির অভিযোগ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান তদন্ত বা জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি। সাধারণ বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সিসিটিভি বন্ধ, কক্ষে তালা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অফিসে ঢুকতে বাধা, এসব ঘটনা গবেষণা সংস্কৃতি নয়; বরং প্রতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্যও উদ্বেগজনক বার্তা।