পাসের হারে ভাটা, কমেছে জিপিএ ৫

এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ : গত বছর ছিল ৮৩.০৪% এ বছর ৬৮.৪৫% মাদরাসা বোর্ডেও পাসের হার ও জিপিএ ৫ হ্রাস

সামগ্রিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের এ ফলাফলকে প্রকৃত অর্জন বলে মনে করছেন খোদ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
ফল প্রকাশের পর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বাঁয়ে) ও ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের উল্লাস
ফল প্রকাশের পর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বাঁয়ে) ও ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের উল্লাস |নয়া দিগন্ত

এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে এ বছর পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটোই কমেছে। এবার গড় পাসের হার ৬৮.৪৫ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হার কমেছে ১৪ শতাংশেরও বেশি। একই সাথে এ বছর জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল এক লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। অবশ্য দেড় যুগ পর এবারের ফলাফলেই শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জনের প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। সামগ্রিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের এ ফলাফলকে প্রকৃত অর্জন বলে মনে করছেন খোদ ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির। তিনি বলেন, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কাউকে কোনো গ্রেস মার্কস বা অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের যে যার অর্জন অনুসারেই এ ফলাফল পেয়েছে তারা। যদিও গত ১৭ বছরে আওয়ামী আমলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা আর শিখন অর্জনের চেয়ে পাসের হার বাড়াতে নানা ফন্দিফিকিরের অজুহাত ছিল বিস্তর। যে কারণে এসএসসি এবং এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়ার পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণও হতে পারেননি অনেকে।

গতকাল বৃহস্পতিবার চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এদিন দুপুর ২টায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড থেকে একযোগে প্রকাশ করা হয়। সূত্র জানায়, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। ফেল করেছেন ছয় লাখ ৬৬০ পরীক্ষার্থী। চলতি বছর ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড়ে পাস করেছে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। গতবার এই পাসের হার ছিলো ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন এক লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। এসএসসি ও সমমানে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭। চলতি বছর ৩০ হাজার ৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন শিক্ষার্থী তিন হাজার ৭১৪ টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হারের দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে- রাজশাহী বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় এক লাখ ৯৫ হাজার ১১৫ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন দুই লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন। দাখিলে ৬৮ দশমিক ০৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গতবার এ পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এবার দাখিলে মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯ হাজার ৬৬ জন। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ২০৬ পরীক্ষার্থী। এবার দাখিলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে। এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন এক লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ জন। গতবার এ পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এবার মোট জিপিএ-৫ পেয়েছে চার হাজার ৯৪৮ জন। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন চার হাজার ৭৮ জন পরীক্ষার্থী। এবার এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ও জিপিএ ৫ বেড়েছে। ঢাকা বোর্ডে ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এবার এ বোর্ডের মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন প্রায় ৩৭ হাজার ৬৮ শিক্ষার্থী। গতবার এ বোর্ডের পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৪৯ হাজার ২৯০ পরীক্ষার্থী। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ও জিপিএ ৫ এর সংখ্যা কমেছে।

শিখন অর্জনের এটিই প্রকৃত চিত্র : চলতি বছরের এসএসসির ফলাফলে যে চিত্র উঠে এসেছে এটিই প্রকৃত চিত্র বলে মন্তব্য করেছেন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দোকার এহসানুল কবির। তিনি বলেন, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কাউকে কোনো গ্রেস মার্কস বা অতিরিক্ত নম্বর প্রদান করা হয়নি। এহসানুল কবির বলেন, আমরা যে ফল প্রকাশ করেছি, সেটি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃত ফল। পরীক্ষায় কোনো ধরনের অতিরিক্ত নম্বর বা গ্রেস মার্কস দেয়ার প্রক্রিয়া চলতি বছর অনুসরণ করা হয়নি। তিনি জানান, মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে এবং পরীক্ষকদেরও সেভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। ফলে এ ফলাফলই প্রকৃৃত ও সত্য। এ নিয়ে সন্দেহ-সংশয় বা ক্ষোভের কোনো সুযোগ নেই। অধ্যাপক এহসানুল কবির আরো বলেন, বিগত বছরে কী হয়েছে, কিভাবে ফল তৈরি করা হয়েছে, তা আমরা বলব না। এখন যে ফল আমরা দিয়েছি সেটিই প্রকৃত। উত্তরপত্র যথাযথ মূল্যায়নের পর যা এসেছে, সেটি উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে আমাদের কোনো হাত নেই। তিনি বলেন, এবার আমাদের ওপর মহল থেকে কোনো ধরনের চাপ ছিল না। আমাদের বলা হয়েছিল যে রেজাল্ট হবে, ে সটিই দিতে হবে। আমরাও পরীক্ষকদের এ অনুরোধ জানিয়েছি। তাদের যথার্থভাবে খাতা মূল্যায়ন করার জন্য বলা হয়েছে। বিশেষ কোনো নির্দেশনা ছিল না জানিয়ে খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, শিক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছে, সে অনুসারে নম্বর পেয়েছে। শিক্ষার্থীদের খাতার প্রাপ্ত নম্বরই যথাযথভাবে আমরা কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। কোনো নির্দিষ্ট নম্বর পাওয়ার পর বিশেষ নম্বর দিয়ে ভালো গ্রেড করে দেয়া হয়নি। ফলাফল তৈরিতে কোনো উদারনীতিও অবলম্বন করা হয়নি।

এবারো এগিয়ে মেয়েরা : চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় আবারো ছেলেদের ে পছনে ে ফলে সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে মেয়েরা। প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাসের হার ও জিপিএ-৫ উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রীদের জয়জয়কার। এ অর্জন শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও। এবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যা ছিল সাত লাখ ৭৯ হাজার ৭৫৭ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৭৭ জন। মেয়েদের মধ্যে পাসের হার ৭০. ৬৭ শতাংশ। অন্য দিকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছেলেদের সংখ্যা ছিল ছয় লাখ ৯৯ হাজার ৫৫৩ জন; যেখানে পাস করেছেন চার লাখ ৫৫ হাজার ৪৭৭ জন। ছেলেদের মধ্যে পাসের হার ৬৫. ১১ শতাংশ।

এ বছর সকল শিক্ষা বোর্ডে ছাত্রের চেয়ে ছাত্রী ৩.৭৯% বেশি পাস করেছেন এবং আট হাজার ২০০ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৭৩ হাজার ৬১৬ জন এবং ছাত্রের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৪১৬ জন। অর্থাৎ ছেলেদের তুলনায় আট হাজার ২০০ জন মেয়ে জিপিএ-৫ বেশি পেয়েছেন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৫৮ হাজার ২৩৮ এবং ছাত্রী ৬৬ হাজার ৭৮০ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রীরা।

শতভাগ পাস ও ফেলের প্রতিষ্ঠান : চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সারা দেশের ১৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৫১। আর ৯৮৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার শতভাগ। ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মাদরাসা বোর্ডেও পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটোই কমেছে

মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটোই কমেছে। এবার মাদরাসা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা দিয়ে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১১৫ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন। দাখিলে ৬৮ দশমিক ০৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। গতবার এই পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এবার দাখিলে মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৬৬ জন। গতবার জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১৪ হাজার ২০৬ পরীক্ষার্থী। এবার দাখিলে পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমেছে।

অপরদিকে এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ জন। গতবার এই পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এবার মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪ হাজার ৯৪৮ জন। গতবার জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৪ হাজার ৭৮ জন পরীক্ষার্থী। এবার এসএসসি ও দাখিল ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ও জিপিএ ৫ বেড়েছে।

কুমিল্লায় জিপিএ ৫ এবং পাসের হারে এগিয়ে মেয়েরা

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ও পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে। এবার পরীক্ষার পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৯০২ জন শিক্ষার্থী। পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে কম পাসের হার। জিপিএ ৫ পেয়েছে ১২ হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থী। এ বছর কমেছে পাসের হার ও জিপিএ ৫। বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের মিলনায়তনে ফলাফল ঘোষণা করেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো: শামছুল ইসলাম।

ফলাফল বিবরণীতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে সর্বমোট এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৭২ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। পাস করে এক লাখ ছয় হাজার ৫৮১ জন। পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬০। এ বছর মেয়ে পরীক্ষার্থী ছিল ৯৭ হাজার হাজার ৭৩৪ জন। পাস করেছে ৬২ হাজার ৮০১ জন। পাসের হার ৬৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। ছেলে শিক্ষার্থী ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৮ জন। পাস করেছে ৪৩ হাজার ৭৮০ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। বোর্ডে শতভাগ পাস করেছে ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা। শূন্যভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১টি।

চট্টগ্রামে জিপিএ ৫ বাড়লেও কমেছে পাসের হার

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এবার এক হাজার ১৬৪ স্কুলের এক লাখ ৪১ হাজার ৩৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ১১ হাজার ৮৪৩ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এ বছর অকৃতকার্য হয়েছে ৩৯ হাজার ২০৭ জন পরীক্ষার্থী; যা গত বছর ছিল ২৪ হাজার ৯৩৫ জন। ২০২৩ সালে ছিল ৩৩ হাজার ১৫২ জন, ২০২২ সালে অকৃতকার্য হয়েছে ১৮ হাজার ৪৭০ জন এবং ২০২১ সালে ১৪ হাজার ৪৬ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে এবারের পরীক্ষায়। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ২০২৫ সালের প্রকাশিত এসএসসির ফলাফল বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

এ দিকে এ বছর সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার কারণ জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, জুলাই আগস্টের আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কিছুটা ব্যাহত হয়। এ ছাড়া এবার খাতা মনিটরিং করার ক্ষেত্রেও কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছে। তাই রেজাল্টে অকৃতকার্যের সংখ্যা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, বর্তমান সরকার আমাদের কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে আমরা শিক্ষাব্যবস্থার সঠিক চিত্রটা তুলে আনি। আমরা এবার সে কাজটিই করেছি। খাতা খুব গুরুত্ব দিয়ে মনিটরিং করা হয়েছে; যাতে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি না থাকে।

এ ছাড়া অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হারেও ধস নেমেছে। এ বছর ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে; যা গত বছর ছিল ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ। যেটি ২০২৩ সালে ছিল ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ছিল ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯১ দশমিক ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। এ বছর ছাত্রী পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ১৯ শতাংশ।

রাজশাহী বোর্ডে ৭ বছরের মধ্যে পাসের হার সর্বনিম্ন

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, এবার রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এসএসসিতে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সাত বছরের মধ্যে বোর্ডের এই ফল সর্বনিম্ন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রকাশিত সাত বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন মোতাবেক রাজশাহী বোর্ডে গত বছর এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে এবার তা কমে ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ৮৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, ২০২০ সালে ৯০ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ৯১ দশমিক ৬৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছিল।

রাজশাহী বোর্ডে এ বছর মোট পরীক্ষার্থী ছিল এক লাখ ৮২ হাজার ৭৯২ জন। এর মধ্যে এক লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৩ জন পাস করেছে। পাসকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাত বছরের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন। জিপিএ ৫ পাওয়া শিার্থীর সংখ্যাও এবার সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এবার জিপিএ ৫ পেয়েছে ২২ হাজার ৩২৭ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১০ হাজার ৩৬৫ জন ও ছাত্রী ১১ হাজার ৯৬২ জন। এবার ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছাত্র এবং ৮২ দশমিক ০১ শতাংশ ছাত্রী পাস করেছে।

পাসের হার কমেছে যশোর বোর্ডে

যশোর অফিস জানায়, এসএসসির ফলাফলে পাসের হার কমেছে যশোর শিক্ষা বোর্ডে। এ বছর পাস করেছে ৭৩.৬৯ শতাংশ; যা গত তিন বছরের চেয়ে কম। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৯২.৩৩। তার আগের বছর ২০২৩ সালে ছিল ৮৬.১৭ এবং ২০২২ সালে ছিল ৯৫.১৭ শতাংশ। যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এ বছর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এক লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছে এক লাখ দুই হাজার ৩১৯ জন। এদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৪১০ জন।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৩৯ হাজার ৮৫৭ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৩৬ হাজার ১৭৭ জন। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৩ হাজার ৩৭৪ জন। মানবিক বিভাগ থেকে ৮৩ হাজার ৪৪৪ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৫৩ হাজার ৮৩১ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে এক হাজার ৩৭৪ জন। এ ছাড়া বাণিজ্য বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়েছে ১৫ হাজার ৫৫০ জন। এরমধ্যে পাস করেছে ১২ হাজার ৩১১ জন।

দুপুর দুটোর দিকে বোর্ডের সম্মেলন করে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর মোসাম্মৎ আসমা বেগম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সচিব প্রফেসর এস এম মাহবুবুল আলম, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ডক্টর আব্দুল মতিন, কলেজ পরিদর্শক তৌহিদুজ্জামান, সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট জাহাঙ্গীর কবির, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (মাধ্যমিক) আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। এ বছর দু’টি স্কুল থেকে একজনও পাস করতে পারেনি বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে উল্লেখ করা হয়।

সিলেট বোর্ডে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ ৫

সিলেট ব্যুরো জানায়, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সিলেট বোর্ডে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ ৫। এ বছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ পেয়েছে তিন হাজার ৬১৪ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৫ হাজার ৪৭১ জন।

গত বৃহস্পতিবার বেলা ১টায় সিলেট শিক্ষা বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

চলতি বছর এসএসসিতে সিলেট বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল এক লাখ দুই হাজার ২১৯ জন। তার মধ্যে পাস করেছে ৭০ হাজার ৯১ জন। জিপিএ ৫ পেয়েছে তিন হাজার ৬১৪ জন। তন্মধ্যে মধ্যে ছাত্র এক হাজার ৭৯১ জন ও ছাত্রী এক হাজার ৮২৩ জন।

জিপিএ ৫ প্রাপ্ত তিন হাজার ৬১৪ জন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিন হাজার ৪১১ জন, মানবিক বিভাগ থেকে ১০৯ জন ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ৯৪ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে।

জেলাভিত্তিক ফলাফলে সিলেট জেলায় ৭২ দশমিক ৬৩%, ৬৯ দশমিক ৩৭%, মৌলভীবাজার জেলা ৬২ দশমিক ৫৬% ও হবিগঞ্জ জেলায় ৬৫ দশমিক ৯৫% শিক্ষার্থী পাস করেছে।

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৮.২২

ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ২০২৫ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীার ফলাফলে ময়মনসিংহ শিক্ষা পাশের হার ৫৮.২২ শতাংশ। যা গত বছরের তুলনায় অনেকটা কম।

বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা বোর্ড হল রুমে এ ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এ সময় শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো: শহীদুল্লাহ জানান, চলতি বছরে মোট এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৫৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে পাস করেছে ৬১ হাজার ৪৫৬ জন এবং জিপিএ ৫ পেয়েছে ছয় হাজার ৬৭৮ জন পরীক্ষার্থী।

জেলাভিত্তিক ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জামালপুরে মোট ২৫ হাজার ৭৮৭ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে পাস করেছে ১৫ হাজার ৩৩৬ জন (পাসের হার ৫৯.৪৬%), নেত্রকোনায় ১৯ হাজার ৪১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ হাজার ৬৬৯ জন (পাসের হার ৬০.০৮%), ময়মনসিংহে ৪৫ হাজার ৮৫৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৬ হাজার ৬৯১ জন (পাসের হার ৫৮.২০%) এবং শেরপুরে ১৪ হাজার ৪৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে সাত মহাজার ৭৬০ জন (পাসের হার ৫৩.৫৪%)। উল্লেখযোগ্য যে, জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিন হাজার ১২৩ জন ছাত্র এবং তিন হাজার ৫৫৫ জন ছাত্রী রয়েছেন।

রংপুর বিভাগে এবারো মেয়েরা এগিয়ে

রংপুর ব্যুরো জানায়, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে রংপুর বিভাগের আট জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এবারো এসএসসি পরীক্ষার ফলাফাল মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে পাস ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তির দিক দিয়ে। এবার এই বিভাগের ৪৮ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস করলেও শতভাগ ফেল করেছে ১৩টি প্রতিষ্ঠান। এবারো রংপুর মহানগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাশে ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে র্শীর্ষে রয়েছে।

দিনাজপুর বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে এই বোর্ডে এবার ৬৭ দশমিক ০৩ ভাগ পাশ করেছে। গত বছর এই পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৪৩ ভাগ। এবার এই বোর্ডের অধীনে ২৮০টি কেন্দ্রে বিভাগের দুই হাজার ৭৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ ৮৫ হাজার ৬৭ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে এক লাখ ২২ হাজার ১৪৬ জন। এর মধ্যে এবার ছাত্রী পাসের হার বেশি ৬৯ দশমিক ৭৯ ভাগ। গতবার যা ছিল ৮১ দশমিক ০৭ ভাগ। এবার ছাত্র পাশের হার ৬৪ দশমিক ৩৮ ভাগ হলেও গত বছর তা ছিল ৭৫ দশমিক ৮৫ ভাগ।

বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আরো দেখা যায়, এবার এই বোর্ডে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৫ হাজার ৬২ জন। এর মধ্যে মেয়ে পেয়েছে সাত হাজার ৫৪৬ জন। আর ছেলেরা পেয়ে সাত হাজার ৫১৬ জন। এবার ৩০ জন ছাত্রী বেশি জিপিএ ৫ পেয়েছে। গত বছর এই বোর্ডে ৩৫৪ জন ছাত্রী জিপিএ ৫ বেশি পেয়েছিল।

ফলাফলে দেখা গেছে এই বোর্ড থেকে এবার ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ পাস করলেও গত বছর শতভাগ পাস করেছিল ৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্য দিকে এবার ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউই পাস করেনি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৪টি।