- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন মো: মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে জবানবন্দী পরবর্তী দীর্ঘ জেরায় সাক্ষী দাবি করেন, তাকেসহ আরো কয়েকজনকে জঙ্গি সাজিয়ে নাটক করা হয়েছিল। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জেরার একপর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো দাবি করেন, ২০২০ সালের ৬ মার্চ ফতুল্লা থানার ২০/(৩)২০২০ নম্বর মামলায় হকার্স মার্কেটের ‘আল করিম হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ থেকে মাসরুরসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব-১১। এ সময় তার ব্যাগ থেকে উগ্রবাদী লিফলেট ও বই জব্দ করা হয় এবং তিনি জেএমবির সদস্য ছিলেন। আইনজীবীর এমন দাবি নাকচ করে দিয়ে সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী আদালতে বলেন, ‘ইহা সত্য নহে যে ০৬-০৩-২০২০ তারিখ আল করিম হোটেল থেকে আমিসহ আরো কয়েকজনকে আটক করা হয়। তবে ওই দিন আমাকেসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে সেখানে জঙ্গি নাটক সাজানো হয়েছিল।’ তিনি আরো জানান, র্যাব তার ব্যাগ থেকে কোনো উগ্রবাদী সরঞ্জাম জব্দ করেনি এবং তিনি কখনোই জেএমবির সদস্য ছিলেন না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে করা ফেসবুক পোস্টের বিষয়েও আইনজীবীর প্রশ্নের সম্মুখীন হন এই সাক্ষী। জবাবে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আসার বিরোধিতা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলাম, তবে সেই পোস্টের তারিখ এখন মনে নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী কতবার বাংলাদেশে এসেছেন সেটিও মনে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২১ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে তিনি মার্চ মাসে এসেছিলেন কি না তা আমার মনে নেই।’ মোদির সফরের বিরোধিতা করে দেয়া সেই ফেসবুক পোস্টটি তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) কাছে জমা দিয়েছেন জানালেও কোন তারিখে সেটি দিয়েছেন, তা মনে করতে পারেননি মাসরুর।
শুনানি চলাকালে আদালতে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইনজীবী টিটোকে তার সহযোগী আইনজীবী আবুল হাসান একটি প্রশ্ন মনে করিয়ে দিতে চাইলে আদালত তাতে হস্তক্ষেপ করেন। বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ প্রশ্ন করেন, ‘আরেকজন এসে কি মাঝখানে আপনার প্রশ্ন মনে করিয়ে দিতে পারেন?’ তখন আইনজীবী টিটো ‘স্যরি’ বলে আবার জেরা শুরু করেন। ওই প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী জানান, ২০২০ সালে বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব ও লকডাউন চলাকালে তিনি জেলে আটক ছিলেন এবং সেখান থেকেই বিষয়টি জানতে পারেন।
জেরায় মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী স্বীকার করেন যে, ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত আসামি শাফিউর রহমান ফারাবী জামিন পাওয়ার পর তার সাথে ছবি তুলে তিনি ফেসবুকে দিয়েছিলেন। তবে ২০২৫ সালের কেরানীগঞ্জ মাদরাসায় বোমা বিস্ফোরণ মামলার আসামি আলামীনের সাথে ছবি তোলার কথা তিনি অস্বীকার করেন। তিনি আরো জানান, জেলখানায় জনির সাথে তার পরিচয় হয়েছিল, যে নিজেও গুমের শিকার।
সাক্ষী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী এই মামলায় দাবি করেছেন, ২০২০ সালের ১ মার্চ তাকে গুম করা হয়। এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ১৭ জন আসামি রয়েছেন। বর্তমানে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আটক থাকা ১০ জন সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্মকর্তাকে গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহাবুব আলম এবং কে এম আজাদ; কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে); লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম সুমন ও মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
এই মামলার অপর সাত আসামি পলাতক। তারা হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরে আইজিপি হন), এম খুরশীদ হোসেন ও মো: হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন সহিদুল ইসলাম সরদার ও আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা। জেরা শেষ না হওয়ায় আদালত আগামী ২২ এপ্রিল পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন। ওই দিন অবশিষ্ট জেরা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
২ শিবির নেতার পায়ে গুলি : আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন
এদিকে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় ছাত্রশিবিরের দুই নেতার পায়ে গুলির ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) গঠন করা হয়েছে। যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার এই অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যশোরের চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনের পায়ে গুলি করা হয়। পরে গুলি করা ক্ষতস্থানে বালু ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়। বালু ঢোকানোর কারণে তাদের পায়ে পচন ধরে। একপর্যায়ে তাদের পা কেটে ফেলতে হয়।
এই মামলার আট আসামির মধ্যে তিনজন গ্রেফতার আছেন। তারা হলেন আকিকুল ইসলাম, সাজ্জাদুর রহমান ও কাজী জহুরুল হক। তারা তিনজনই পুলিশের সাবেক সদস্য। আজ তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পড়ে শোনানোর পর উপস্থিত এই তিন আসামির কাছে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান যে তারা অভিযোগ স্বীকার করেন কি না। জবাবে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।
যশোরের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ এই মামলার পাঁচ আসামি পলাতক।


