কারেন্ট জাল বন্ধে কঠোর হচ্ছে সরকার

কাওসার আজম
Printed Edition

  • উৎপাদন বন্ধে আইন সংশোধন, লাইসেন্স বাতিলসহ সমন্বিত অভিযানে সরকার
  • এক জেলাতেই বছরে প্রায় পৌনে ২০০ কোটি টাকার নিষিদ্ধ জাল জব্দ

একের পর এক অভিযান, শত শত কোটি টাকার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ ও আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস, কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন-নানা উদ্যোগের পরও থামছে না কারেন্ট জালের উৎপাদন ও ব্যবহার। দেশের মৎস্যসম্পদ, বিশেষ করে ইলিশের প্রজনন ও জাটকা সংরক্ষণের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠা এই অবৈধ জাল বন্ধে এবার আরো কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার।

অবৈধ কারেন্ট জালের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে আইন সংশোধন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, কারখানা ও আড়তের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত অভিযান জোরদারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘অবৈধ কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধে করণীয়’ শীর্ষক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীসূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অভিযানের পরিসংখ্যান বলছে, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। শুধু মুন্সীগঞ্জ জেলাতেই বড় তিনটি অভিযানে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকার অবৈধ কারেন্ট জাল ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ সদরের ধোপাবাড়ি এলাকায় ছয়টি অবৈধ জাল তৈরির কারখানা ও গুদামে অভিযান চালায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। অভিযানে ২ কোটি ৯০ লাখ মিটার কারেন্ট জাল এবং জাল তৈরির কাজে ব্যবহৃত ৬ হাজার পিস সুতার রিল জব্দ করা হয়। জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক মূল্য ছিল ১০১ কোটি টাকা। পরে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এসব জাল ও সুতার রিল আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।

এর আগে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তারপুর এলাকায় পাঁচটি জাল তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৮ কোটি ৫৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের ১ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া একই বছরের ডিসেম্বরে মুন্সীগঞ্জে আরেক অভিযানে ৩৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও সুতার রিল জব্দ করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের সভায় মৎস্য অধিদফতরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো: আবুল কালাম আজাদ জানান, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলায় অবৈধ কারেন্ট জাল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে কয়েকটি কারখানা কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য অবৈধ জাল উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিলের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, সভায় মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানান, গত ১৩ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ কম্বিং অপারেশন পরিচালনা করা হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ কারেন্ট জাল ও প্রায় পাঁচ হাজার রিল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। একই সাথে ৩৯টি কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে অনেক ক্ষেত্রে অভিযানের তথ্য আগেই কারখানা মালিকদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না বলে সভায় জানান জেলা প্রশাসক। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অবৈধ কারেন্ট জাল উৎপাদনের উৎস বন্ধ না করা গেলে শুধু জাল জব্দ ও ধ্বংস করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বছরের পর বছর অভিযান এবং বিপুল পরিমাণ জাল জব্দের পরও উৎপাদন অব্যাহত থাকায় বিদ্যমান আইন ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা আরো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

মৎস্য অধিদফতরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ সভায় বলেন, অবৈধ কারেন্ট জাল উৎপাদন বন্ধে প্রতিদিন দিনে ও রাতে পৃথক দু’টি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। প্রতিটি অভিযানে নৌ-পুলিশের একটি দলকে সম্পৃক্ত করারও প্রস্তাব দেন তিনি। নিয়মিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা গেলে অবৈধ জাল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে মত দেন তিনি।

মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো: জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, অভিযানের তথ্য যাতে আগাম ফাঁস না হয়, সে জন্য অনেক কারখানার প্রবেশমুখে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তিনি জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে মুন্সীগঞ্জে সরেজমিন পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ সংশোধনের মাধ্যমে কারেন্ট জাল উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোকে আরো স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনতে মৎস্য অধিদফতর মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবে। একই সাথে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অভিযানের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অপারেশন টিমের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে দিন ও রাতের জন্য পৃথক টিম গঠন করে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, জেলা পুলিশ ও র‌্যাবের সহায়তায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। উৎপাদন কারখানা, আড়ত ও গুদাম পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে। কোথাও অবৈধ কারেন্ট জাল পাওয়া গেলে শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন অথবা লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করবে। অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট কারখানা ও আড়তের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদর দফতরে চিঠি পাঠানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ দিকে, দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, প্রজনন ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে আগামী ১১ জুন। গত ১৫ এপ্রিল থেকে এ নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ সময়ে কোনো মৎস্য নৌযান সামুদ্রিক জলসীমায় মাছ আহরণ করতে পারবে না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা, ২০২৩-এর বিধি ৩-এর উপবিধি (১)-এর দফা (ক) অনুযায়ী বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় প্রতিবছরের মতো এ বছরও ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মোট ৫৮ দিন সব ধরনের মৎস্য নৌযানের মাধ্যমে যেকোনো প্রজাতির মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মানতে সব মৎস্য নৌযান মালিক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ নিষেধাজ্ঞা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও পুনরুৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।