র‌্যাবের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন হচ্ছে

Printed Edition
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমাদ রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে র‌্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন : পিআইডি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমাদ রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে র‌্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সম্পূর্ণভাবে মানবাধিকারকে সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে আগামী দিনে একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার র‌্যাব ফোর্সেসের আইনি কাঠামোতে সংস্কার এনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুসংহত নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

গতকাল সোমবার ঢাকায় র‌্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে আয়োজিত এই বাহিনীর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, র‌্যাব মূলত বাংলাদেশ পুলিশ (৪৪ শতাংশ), সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ (৪৪ শতাংশ) এবং আনসার, বিজিবি ও সিভিল স্টাফদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সম্মিলিত এলিট ফোর্স। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

র‌্যাবের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে শেখ হাসিনা তার একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার উদগ্র বাসনা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এই বাহিনীকে পুতুলের মতো ব্যবহার করেছিলেন। কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আইনবহির্ভূত ও বিপথগামী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ সমগ্র প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা সুনির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার অপরাধের দায়দায়িত্ব পুরো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না।

মন্ত্রী বলেন, দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে স্ব-স্ব বাহিনীর নিজস্ব আইনি কাঠামো অনুযায়ী কঠোর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অনুশাসন দেয়া হয়েছে। একই সাথে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন আইনের অধীনে যখন এই বাহিনীকে সংস্কার, পুনর্গঠন কিংবা নতুনভাবে নামকরণ করা হবে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করবে।

আইনি সংস্কারের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৫-২০ বছর যাবৎ র‌্যাব সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাধীন আইনের অধীনে পরিচালিত না হয়ে, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটি বিশেষ ধারার ওপর ভিত্তি করে মূলত ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছিল। একটি রাষ্ট্রীয় এলিট ফোর্স এভাবে সুদীর্ঘকাল অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামোয় চলতে পারে না। এই আইনি ত্রুটি দূর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘আইন প্রণয়ন কমিটি’ গঠন করেছে, যা মন্ত্রী নিজেই সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন। প্রস্তাবিত নতুন আইনে বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব, দায়িত্বের পরিধি এবং একই সাথে কঠোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের বিধান যুক্ত করা হবে। বাহিনীর বর্তমান সম্পদ, লজিস্টিকস ও সক্ষমতা এই নতুন আইনের অধীনে প্রতিস্থাপিত হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত তিন মাসে পুলিশ, র‌্যাব কিংবা অন্য কোনো বাহিনীকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা কোনো দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। জনগণের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এই বাহিনীর একমাত্র লক্ষ্য।

বিগত সরকারের আমলের গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত এবং বিচারের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, পূর্ববর্তী গুম কমিশনের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট আইনগত এখতিয়ার ছিল না। ফলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন ও শক্তিশালীকরণের কাজ করছে। এই আইনের সংস্কার সম্পন্ন হলে গুমের শিকার, গুমের হুমকিপ্রাপ্ত কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের সবধরনের অপরাধের বিচার সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় এই বিশেষ আদালতেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং ভিকটিম বা তাদের পরিবার সরাসরি ন্যায়বিচার পাবে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, আইজিপি মো: আলী হোসেন ফকির, র‌্যাবের মহাপরিচালক মো: আহসান হাবীব পলাশসহ বিভিন্ন সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সিঙ্গাপুরের অনিবাসী হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সাথে গতকাল বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অফিসকক্ষে সিঙ্গাপুরের অনিবাসী হাইকমিশনার ডেরেক লো সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

এ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি, সাইবার সিকিউরিটি, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমনে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনগত সহায়তাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও বহুমুখী। এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পারস্পরিক অভিন্ন স্বার্থ, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উভয় দেশই পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একই ধরনের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে থাকে।

সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনার মন্ত্রীর সাথে ঐকমত্য পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও বন্ধুপ্রতিম দেশ। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ থেকে সিনিয়র পুলিশ অফিসারদের একটি প্রতিনিধিদল সিঙ্গাপুরে পাঠানো যেতে পারে।

হাইকমিশনার আরো জানান, সিঙ্গাপুর উন্নয়নশীল দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ‘সিঙ্গাপুর কো-অপারেশন প্রোগ্রাম’-এর আওতায় বছরব্যাপী প্রায় ৩০০টি সভা, সেমিনার, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করে থাকে, যেখানে বাংলাদেশও অংশ নিতে পারে।

বৈঠকে হাইকমিশনার ডেরেক লো আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমনে দুই দেশের মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের ওপর জোর দেন। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত কঠোর এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অবস্থান করছে।

পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সিঙ্গাপুরের নিকট ‘ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা’ বিষয়ক চুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সিঙ্গাপুর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সম্মতি পাওয়া গেলে উভয় দেশ দ্রুততম সময়ে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারবে, যা অপরাধ দমনে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।