আসিয়ান সম্মেলনে শান্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির বহুমাত্রিক বার্তা

Printed Edition
কুয়ালালামপুরে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে আনোয়ার ইব্রাহীমের পাশে বসে বক্তব্য দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প : ইন্টারনেট
কুয়ালালামপুরে আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে আনোয়ার ইব্রাহীমের পাশে বসে বক্তব্য দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প : ইন্টারনেট
  • দায়িত্ব নেয়ার পর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ট্রাম্পের এটি প্রথম সফর
  • সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে শুল্ক ও বিরল খনিজ ইস্যু শীর্ষে রয়েছে

আলজাজিরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ছয় দিনের এশিয়া সফরের সূচনা করেছেন মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ৪৭তম আসিয়ান সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এই সফরকে ঘিরে শান্তি উদ্যোগ, বাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য পুনর্গঠনের নানা মাত্রা উঠে এসেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্মেলনের প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির সাক্ষী হন, যা থাইল্যান্ড ও কাম্বোডিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের অবসান ঘটায়। এই চুক্তিকে ‘একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে একটি করে যুদ্ধ শেষ করছি, এটি তারই ধারাবাহিকতা।’ চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ সীমান্তে সেনা মোতায়েন কমাবে এবং যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পে অংশ নেবে।

যুক্তরাষ্ট্র থাইল্যান্ডের সাথে একটি নতুন বাণিজ্য কাঠামো ঘোষণা করেছে, যার আওতায় থাই সরকার ৯৯ শতাংশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমাবে। একই সাথে ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮ বিলিয়ন ডলারের বোয়িং বিমান এবং ২.৯ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য কিনবে। এই চুক্তিগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ফেয়ার ট্রেড’ নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা এশিয়ার বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়াবে।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক

এ দিকে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটি নতুন আলোচনার কাঠামোতে পৌঁছেছে- যার আওতায় ট্রেড, ফেন্টানিল এবং টিকটকের মতো প্রযুক্তিবিষয়ক ইস্যুতে আলোচনা হবে। এই আলোচনা ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় আসন্ন বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সফরের শুরুতে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মনে করি আমরা চীনের সাথে একটি দারুণ চুক্তিতে পৌঁছাতে যাচ্ছি।’ তিনি আরো জানান, এই চুক্তি না হলে মার্কিন কৃষকরা চীনের বিশাল বাজার হারাতে পারেন- যা যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য রফতানি গন্তব্য।

চীন ইতোমধ্যে সয়াবিনসহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য আমদানি বন্ধ করেছে এবং বিরল খনিজের রফতানি সীমিত করেছে, যা মার্কিন প্রযুক্তি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সফরকে ‘লোহার পাশার ছোড়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকরা, কারণ এটি তার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশ সফর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার সাথে বৈঠক করেন। লুলা ভেনেজুয়েলার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়নে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেন এবং মার্কিন শুল্ক ও ম্যাগনিটস্কি অ্যাক্টের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই বৈঠক লাতিন আমেরিকার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।

মালয়েশিয়ার ভূমিকায় নতুন মাত্রা

এই সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং গ্লোবাল সাউথের মধ্যে একটি ‘কূটনৈতিক সেতু’ হিসেবে তুলে ধরছে। দেশটি ব্রিকসের সাথে সম্পর্ক জোরদার করছে এবং একই সাথে পশ্চিমা শক্তির সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে।

মালয়েশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান বাণিজ্য আলোচনায় ১৯ শতাংশ শুল্ক হ্রাস এবং ইস্পাত ও সেমিকন্ডাক্টর পণ্যের জন্য বিশেষ ছাড় আদায়ের লক্ষ্যে ‘জোরালো চাপ’ প্রয়োগ করছে বলে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম মালয়েশিয়ার গবেষক ব্রিজেট ওয়েলশ। আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আলোচনাগুলো আশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে।’

মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ইস্পাত ও সেমিকন্ডাক্টর খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে নিজের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে চায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নিরাপত্তা ও উৎপাদন সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করতে ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও ওয়েলশ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বরাবরই শক্তিশালী, যদিও গাজা যুদ্ধের মতো কিছু ইস্যুতে উভয় দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।’ তা সত্ত্বেও, দুই দেশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রেয়ার আর্থ মিনারেলসহ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরো গভীর সম্পর্ক গড়ার দিকে এগোচ্ছে।

প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ

এ দিকে সম্মেলনের বাইরে কুয়ালালামপুরে ফিলিস্তিনের পক্ষে শত শত বিক্ষোভকারী ট্রাম্পের সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। তারা অভিযোগ করেন, গাজায় ইসরাইলি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সমর্থন রয়েছে। ‘ট্রাম্প গাজায় হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না’- এমন সেøাগানে মুখরিত হয় শহরের রাজপথ।

এই সম্মেলন ও সফর ট্রাম্প প্রশাসনের বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন, যেখানে শান্তি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতি একত্রে জড়িত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় উপস্থিতি নতুন ভারসাম্য গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।