চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষককে জনতার হাতে দিতে পুলিশের গাড়িতে আগুন-সংঘর্ষ

৪ গুলিবিদ্ধসহ আহত ৪০

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে চার বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগে আটক ব্যক্তিকে জনতার হাতে তুলে দেয়ার দাবির জেরে পুলিশের সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে বৃহস্পতিবার মধ্য রাতে। বিক্ষুব্ধ জনতার আড়ালে পতিত ফ্যাসিস্ট অনুসারী যুবলীগ-ছাত্রলীগাররা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের দু’টি গাড়িতে আগুন দেয়াসহ নানা নাশকতা চালিয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। বাকলিয়ার তুলাতলী, নতুন ব্রিজ এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আগুন-ভাঙচুরের একপর্যায়ে শুরু হয় তুমুল সংঘর্ষ। পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে সাধারণ জনতাকে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করে। ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন অলিগলিতে ঢুকে পড়ে মানুষ। কিন্তু পরবর্তীতে আবারো পতিত ফ্যাসিস্টদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে সড়কে আসে তারা, এতে দুই সাংবাদিক গুলিবিদ্ধসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৪০ জন আহত হন।

পুলিশের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর বাকলিয়া থানার চরচাক্তাই নুর চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার বাসিন্দা সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে এলাকাবাসী। অভিযুক্ত মনির ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা গ্যারেজের কর্মচারী। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মনিরকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। ভুক্তভোগী শিশুটিকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।

বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বিক্ষুব্ধ জনতা ধর্ষণের অভিযোগে মনিরকে স্থানীয় বিছমিল্লাহ ভবনে আটকে রাখে। পরে অভিযুক্তকে নিয়ে পুলিশ থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার আগেই রাস্তায় নেমে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে স্থানীয়রা। পুলিশের গাড়ি আটকে মনিরকে বিচারের জন্য তাদের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি জানায় তারা। রাত ৮টার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। রাত ১১টার দিকে র‌্যাব-পুলিশের সাথে স্থানীয় লোকজনের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে তুলাতলী, রাজাখালী ও কালামিয়া বাজার পর্যন্ত এলাকায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক চট্টগ্রাম প্রতিদিনের দুইজন সংবাদকর্মী গুলিবিদ্ধ হন। এ ছাড়া অন্তত ৪০ জন আহত হন।

অভিযোগ উঠেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-যুবলীগও ছাত্রলীগ ঘটনাটি উসকে দিয়ে লোকজন জড়ো করে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলে। পুলিশ-বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন স্পটে তারা হামলা ও নাশকতায় নেতৃত্ব দেন।

বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জানিয়েছেন, গতকাল শুক্রবার দুপুরে মনিরকে আদালতে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে ধর্ষণকালে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশের সাথে স্থানীয়দের সংঘর্ষের ঘটনায় দু’টি মামলার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল পুলিশ। এর মধ্যে একটি ‘শিশু ধর্ষণ’ অন্যটি পুলিশের ওপর হামলার জন্য।

শিশু ধর্ষণের মামলাটি করেন ভুক্তভোগী শিশুটির পিতা। মামলায় গ্রেফতার মনিরকে আসামি করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন বাকলিয়া থানার এক কর্মকর্তা।

মানুষরূপী শয়তানদের শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ঠেকানো যাবে না : ডিসি জাহিদ

এ দিকে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় ধর্ষণের চেষ্টার শিকার চার বছরের ওই শিশুকে দেখতে হাসপাতালে গিয়ে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ঘটনা ঘটার পর শুধু প্রতিবাদ করলেই হবে না, অপরাধ ঘটার আগেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে গিয়ে আহত শিশুটিকে দেখেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তিনি শিশুটির মা ও চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, এই নিষ্ঠুর ঘটনার বিচার নিশ্চিতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তিনি জানান, শিশুটি শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হলেও ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমারও একটি কন্যা সন্তান আছে। মেয়েটিকে আমি দেখেছি- একদম ফুলের মতো একটি শিশু, বয়স মাত্র চার বছর।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করেছে বলেও মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা ছাড়া পরিবর্তন আসবে না। আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।