তুলির ঈদ আনন্দ : আনোয়ারুল ইসলাম

Printed Edition
তুলির ঈদ আনন্দ  : আনোয়ারুল ইসলাম
তুলির ঈদ আনন্দ : আনোয়ারুল ইসলাম

গ্রামের নাম বুজরুকপুর। তুলি এই গ্রামে থাকে। এই গ্রাম একটি ঐতিহাসিক নামের সাথে জড়িত। তুলির পূর্ব পুরুষগণ বুজুর্গ ছিলেন। তাই তাদের এই বুজুর্গ নাম থেকে গ্রামের নাম এসেছে বুজরুকপুর।

ঈদের সকাল। চারদিকে কাঁঠাল পাকা রোদ তাপ ছড়াচ্ছে, মাইকে শোনা যাচ্ছে ঈদের নামাজের সময়ের কথা। আর সেই গ্রামের সবচেয়ে দুষ্টু মেয়ে হলো তুলি। বয়স ১০ বা ১২ হবে; কিন্তু বুদ্ধিতে সে পাকা। সে পুরো গ্রাম একাই মাতিয়ে তোলে।

ঈদের দিন খুব ভোরে তুলি এমন চিৎকার করল যে, সবাই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল।

‘আম্মু! আমার নতুন জুতার একটা নেই!’ বলল তুলি।

তুলির আম্মু দৌড়ে এসে বললেন, ‘কি! কাল রাতে তো ঠিকই ছিল?’

তুলি কান্না করে বলল, ‘ঈদে আমি এক পায়ে জুতা পরে যাবো নাকি?’

বাড়িতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। আব্বু আফজাল হোসেন খাটের নিচে খুঁজছেন, বড় বোন ঝুমুর আলমারিতে খুঁজছেন, মেজ বোন রুলি হাঁসের ঘর ও সেজ বোন জুলি কবুতরের খোপ পর্যন্ত দেখে এলো।

ঠিক তখনই পাশের বাড়ির করিম চাচা এসে বললেন, ‘কী হয়েছে তোমাদের?’

তুলির বাবা আফজাল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘তুলির নতুন জুতার একটি খুঁজে পাচ্ছি না!’

করিম চাচা জ্ঞানীর মতো বললেন, ‘চোরের কাজ মনে হচ্ছে!’

এ কথা শুনে তুলি আরো জোরে কান্না শুরু করল। গ্রামের প্রায় অর্ধেক লোক এসে হাজির। সবাই মিলে জুতা উদ্ধার অভিযান শুরু করল।

একজন বললেন, ‘ না না, শিয়াল নিয়েছে!’

বড় বোন ঝুমুর রেগে বললেন, ‘শিয়াল জুতা নিয়ে কী করবে?’

এদিকে রুলি আপা চুপচাপ হাসছে। তুলি সেটি দেখে সন্দেহ করল।

‘এই আপা, তুই জানিস?’ বলল তুলি।

রুলি আপা মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘না বোন, আমি শুধু দেখেছি...।’

‘কী দেখেছিস?’ বলল তুলি।

‘রাতে তুমি নিজেই তো জুতা লুকিয়েছ!’

সবাই থমকে গেল।

তুলি খচমচিয়ে বলল, ‘আমি?’

রুলি আপা গর্ব করে বললেন, ‘হ্যাঁ! তুমি তো বলেছিলে, ঈদের দিন সকালে সবাইকে নাচাব! তারপর জুতা চালের ড্রামের ভেতরে রেখেছ!’

সবাই দৌড়ে রান্নাঘরে গেল। সত্যি সত্যি চালের ড্রামের ভেতর থেকে জুতাটা বের হলো।

কিছুক্ষণ সবার নীরবতায় কাটল।

তারপর পুরো বাড়ি হেসে ফেটে পড়ল।

তুলির আম্মু বললেন, ‘নিজের ফাঁদে নিজেই পড়েছিস!’

করিম চাচা হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই মেয়েকে বড় হলে গোয়েন্দা বানানো উচিত!’

তুলি লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমি তো শুধু একটু মজা করতে চেয়েছিলাম’।

সেজ আপা জুলি বললেন, ‘তোর মজায় পুরো গ্রাম কাজ বন্ধ করে দিলো!’

এরপর সবাই ঈদের নামাজে গেল; কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। নামাজ শেষে তুলি ঠিক করল, আজ সে খুব ভদ্র থাকবে। তাই সে কোরবানির গোশত গরিব মানুষকে বিতরণের দায়িত্ব নিলো।

কিন্তু বিপদ ঘটল অন্য জায়গায়। তুলি বড় গামলাতে গোশত নিয়ে হাঁটছিল। এমন সময় বাড়ির পোষা কুকুর নীলু পেছন থেকে এসে তার ওড়না কামড়ে ধরল।

তুলি গলা ফেটে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘বাঁচাও, বাঁচাও!’

নীলু টানছে পেছনে আর তুলি টানছে সামনে।

হঠাৎ গামলার গোশত ছিটকে গিয়ে করিম চাচার গায়ে পড়ল। সাদা পাঞ্জাবি রক্তের দাগ লেগে লাল হয়ে গেল। পুরো উঠান হাসিতে ফেটে পড়ল।

করিম চাচা গোশত হাতে নিয়ে বললেন, ‘আজকের ঈদে আমি মানুষ না, গোশত চাচা।’

তুলি হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ল।

সেদিন রাতে তুলির মা বললেন, ‘এই ঈদ গ্রামের মানুষ কোনো দিন ভুলবে না!’

আর সত্যিই এরপর থেকে বুজরুকপুর গ্রামে যখনই ঈদ আসে, সবাই একবার না একবার বলে- ‘সাবধান! তুলি আছে কিন্তু!’