বিশেষ সংবাদদাতা
অতীত সরকারের অনিয়মে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাবে দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন খাতে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। দেশের আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে প্রায় অকার্যকর অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা এখন একটি ক্রসরোডে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে দেশ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করছে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে কাজ করবে তার ওপর।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং (ফার) সামিট ২০২৬’-এ তিনি এ কথা বলেন। দেশে করপোরেট সুশাসন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) বাংলাদেশ, দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-এর যৌথ উদ্যোগে এ সামিট আয়োজন করা হয়।
অডিট সিস্টেম ভেঙে পড়েছে
প্রধান অতিথি বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট ও কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক চিত্র তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু দেশের অডিটিং ও রিপোর্টিং ইকোসিস্টেম প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যাংক থেকে অর্থপাচার, মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ নেয়া এবং পুঁজিবাজারে ভুয়া কোম্পানির তালিকাভুক্তির মতো ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি ফলস রিপ্রেজেন্টেশন করে স্টক মার্কেটে এসেছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এতে ভালো ও স্বচ্ছ কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বেসরকারি খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি রয়েছে। অনেক সফল কোম্পানি এবং একাধিক ব্যাংকও গুরুতর ক্যাপিটাল ডেফিসিটে ভুগছে। এর পেছনে খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার এবং বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা দায়ী।
ব্যাংকের প্রকৃত মালিকা কারা- এই প্রশ্ন উত্থাপন করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীরা। কেউ ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংকের মালিক দাবি করে বোর্ডে বসে নিজেরাই ঋণ অনুমোদন করবে এটা সঠিক নয়। ভবিষ্যতে স্বার্থের সঙ্ঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) কঠোরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
বর্তমান সরকার একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এ জন্য আইসিএবি ও আইসিএমএবির সদস্যদের নিজেদের পেশাগত জায়গা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ (সেলফ রেগুলেশন) নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এফআরসি শুধু ওভারসাইট করতে পারে; কিন্তু সঠিক রিপোর্টিং ও অডিটের দায়িত্ব শুরু হতে হবে আপনাদের ভেতর থেকেই।
বিদেশী বিনিয়োগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বড় বড় আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজার ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে। জেপি মরগ্যানসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসতে চায়।
তিনি বলেন, প্রতিদিনই আমি আন্তর্জাতিক ফান্ড ম্যানেজারদের সাথে বৈঠক করছি। তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠনের কথা বলছে।
অর্থমন্ত্রী অডিটরদের সতর্ক করে বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ আনতে হলে কোম্পানির ব্যালেন্স শিট, অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করতে হবে। সরকার পুঁজিবাজার, আর্থিক খাত ও এনবিআরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ডিরেগুলেশনের পরিকল্পনা করছে। তবে সেটি সফল করতে পেশাজীবীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ডিরেগুলেশন করলাম; কিন্তু রিপোর্টিং ঠিক না থাকলে কোনো লাভ হবে না। দেশের অর্থনীতি বাস্তব অর্থে বড় হলে সবাই লাভবান হবে। তাই আমাদের সবাইকে মিলেই গ্লোবাল বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে কাজ করতে হবে।
অর্থ সচিব ড. মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো: সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। এতে আরো বক্তব্য রাখেন- প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘অতীতে দেখা গেছে নিরীক্ষা ফার্মগুলো নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়েছে। হিসাবরক্ষণ অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বাইরে থেকে গেছে। অতীতের গাফিলতিগুলো পুরো অর্থনীতিকে একধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজ ব্যাংক খাতের যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, তা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।’
রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়েছেন। ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে টাকা হারিয়েছেন। শেয়ারের দাম পড়ে গেছে, বিনিয়োগকারীরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। পরে দেখা গেছে, সেই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা অন্য রকম।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘আমরা জানি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত কিভাবে দুর্বল করা হয়েছে। অথবা আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংক বড় বড় আকারের ঋণ দিয়েছে। পরে তারা ঋণখেলাপি হয়েছেন এবং ব্যাংক সঙ্কটে পড়েছে। এসবের মাধ্যমে সৎ উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অসৎ প্রতিযোগীরা বেশি বেশি লাভ দেখিয়ে বিনিয়োগ খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন। এমন পরিস্থিতি দেখলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসতে চান না।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন অর্থ সচিব মো: খায়েরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, যার ঋণ পাওয়ার কথা নয়, তিনি ঋণ পেয়ে যান। যার ঋণ পাওয়া উচিত, তিনি ব্যাংকে ব্যাংকে ঘুরছেন- এই হচ্ছে ব্যাংকের চিত্র। ব্যাংকে গেলে ঋণ পাওয়ার জন্য তারা একধরনের হিসাব দেন। আবার কর দেয়ার সময় লোকসান দেখিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেন আরেক ধরনের হিসাব। এ অবস্থা থেকে বের হতে হবে।



