দেশের জ্বালানিবাহী ৬ জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি

ইরান নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি জানিয়েছেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বাংলাদেশের ছয়টি জ্বালানিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে। জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য এতদিন আমাদের কাছে না আসার কারণে আমরা এগুলোকে চিহ্নিত করতে পারিনি। এসব তথ্য গত সপ্তাহে আমাদের হাতে এসেছে, যা আমরা তেহরানে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন এটা নিয়ে কাজ চলছে। হরমুজ প্রণালীতে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। এ ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক সহায়তা দেবো।

রাষ্ট্রদূত বলেন, জ্বালানির অভাবে বাংলাদেশের পেট্রলপাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইনের সচিত্র প্রতিবেদন আমরা তেহরানে পাঠিয়ে অনুরোধ করেছি যে এখানে আমাদের ভাইয়েরা বিপদে আছে, তাদের যেন কোনো সমস্যা না হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদত বরণের পর বাংলাদেশের ভাইয়েরা যে প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল ও দোয়ার আয়োজন করেছে, আমরা তার সচিত্র প্রতিবেদনও তেহরানে পাঠিয়েছি, যাতে ইরান কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে বাংলাদেশের ভাইয়েরা আমাদের প্রতি কতটুকু সহানুভূতিশীল। আমি আশা করি, হরমুজ প্রণালীর কারণে বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা শিগগির দূর হবে।

গতকাল রাজধানীর গুলশানে ইরান দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদি এক প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা জানান। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ চলাচল করে। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশটির অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করতে পারছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাহাজে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জ্বালানি নিয়ে শত শত জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের জন্য এই প্রণালী খোলা থাকবে। এই তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া ও ইরাক রয়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদি বলেন, এ সংক্রান্ত বাংলাদেশের দেয়া বিবৃতি নিয়ে আমাদের কষ্টের জায়গা রয়েছে। আমরা জানি, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোতে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছে। কিন্তু ইরানের আপত্তি উপেক্ষা করে এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। এসব ঘাঁটি থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। কয়েকটি দেশ আবার ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের রাজধানীতে দূতাবাস স্থাপনের অনুমোদনও দিয়েছে। এসব ঘাঁটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের সম্ভাব্য অবস্থান লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা তার ধ্বংসাবশেষের আঘাতে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশী নিহত হয়েছে। এজন্য আমরা দুঃখিত। কিন্তু এর দায়-দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়া দেশগুলোর ওপর বর্তায়। তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ অবৈধ। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এই অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানাতে পারে। মুসলিম দেশ না হয়েও স্পেনের মতো অনেক ইউরোপীয় দেশ এই অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা চাই বাংলাদেশ এই অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে জানাক। এর চেয়ে বেশি কিছু না। এই ব্যাপারে আমরা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেইনি। তবে আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাতের অপেক্ষায় রয়েছি। সাক্ষাৎ হলে বিষয়টি উত্থাপন করব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত মঙ্গলবার আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি ইরান থেকে বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ইরান এ পর্যন্ত ১৮০ জনের বেশি বাংলাদেশীকে নিজ দেশে ফেরার ব্যবস্থা করেছে। এদের মধ্যে অনেকেই পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই ইরানে প্রবেশ করেছিল। তাদের নামমাত্র জরিমানা করে দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

ইরানে বর্তমানে কতজন বাংলাদেশী রয়েছে তার পরিসংখ্যান নেই উল্লেখ করে জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস যোগাযোগ করলে আমরা দেশে ফিরতে চাওয়া বাংলাদেশীদের সহায়তা দেবো।

যুদ্ধবিরতির জন্য পাকিস্তানের নেতৃত্বে কয়েকটি দেশের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে জাহানাবাদি বলেন, আমরা চাই যুদ্ধটা এমনভাবে শেষ হোক যাতে পুরো অঞ্চলে টেকসই শান্তি ফিরে আসে এবং স্বাধীন দেশ হিসাবে ইরানের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন যুদ্ধ থেকে পালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি একেক সময় একেক কথা বলেন। ট্রাম্প সকালে বলেন, যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করেছি। দুপুরে বলেন, ইরানের সাথে সমঝোতা চলছে। আর সন্ধ্যায় বলেন, ইরানকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। ট্রাম্প নিজেকে জয়ী ঘোষণা করে মানসিক শান্তি পেলে আমাদের আপত্তি নেই। তিনি বলেন, ইরানে একটি প্রবাদ রয়েছে, কুকুর লেজ নাড়াচ্ছে না, লেজ কুকুরকে নাড়াচ্ছে। এখন ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে খেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রেসিডেন্টরা ইসরাইলের এই ফাঁদে পা দেয়নি।

হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ১৯৮২ সালে জ্যামাইকা চুক্তির ভিত্তিতে এই প্রণালীতে ট্রানজিট সুবিধা থাকার কথা। ইরান সরকার এই চুক্তি সই করলেও দেশটির পার্লামেন্ট তা অনুমোদন করেনি। এখন হরমুজ প্রণালীতে ‘নিরপরাধ প্যাসেজ’ পেতে হলে ইরানের সাথে সমন্বয় করতে হবে। এ জন্য টোলও নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।