কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বিশ্ব বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি বাজার ধরে রাখতে এবং সম্প্রসারিত করতে আরো কঠোর প্রতিযোগিতায় নামতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন একসময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি নানামুখী সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তা, জলবায়ু ঝুঁকি, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন। এর সাথে চলমান জ্বালানি সঙ্কট নতুন মাত্রার জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ এসব বৈশ্বিক পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জাতীয় নীতিনির্ধারণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এগুলোর গভীর প্রভাব রয়েছে।
গতকাল রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির পথনকশাবিষয়ক একটি সম্মেলনে রাখা বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। সম্মেলনে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা যোগ দেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিবাচক হলেও সেটির গতি মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। এতে ভোক্তা চাহিদা কমে আসতে পারে এবং রফতানিতে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী এবং ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে খোলামেলা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
বৈশ্বিক আর্থিক বাজার ও প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উৎপাদন, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রবাহকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণের জন্য অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। বাজারের ওঠানামার কারণে আমরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছি। উন্নত দেশগুলো সাধারণত এক থেকে চার শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে। অথচ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনেকসময়ই ঋণের জন্য ছয় থেকে ১২ শতাংশ বা তারও বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। ফলে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ অর্থায়নে আমাদের প্রবেশাধিকার অনেকটা সীমিত হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, রফতানি বাজারে আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে এবং আরো সম্প্রসারণের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো প্রতিযোগিতা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন করে গুরুত্বারোপ করতে হবে।
অর্থনীতিতে সাম্য ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং অলিগার্কদের ধ্বংস করা বিএনপি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর, স্থিতিশীল ও শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমৃদ্ধি ও মর্যাদার ন্যায্য অধিকার ভোগ করবে। নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে সরকার প্রস্তুত। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র ১০০ দিনের কিছু বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছে। আমাদের লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষা অত্যন্ত সুদৃঢ়। সরকার নতুন সম্ভাবনার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ থাকবে না উল্লেখ করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা পুঁজিবাজার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা একটি নতুন সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন পেয়েছি। আমরা একটি নতুন কমিশন গঠন করেছি, যেখানে সব পেশাদার মানুষ, কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ নেই। কিন্তু ভালো পেশাদার খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ঋণ পরিস্থিতি বড়ই খারাপ। গত দেড় দশকে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে সুদ পরিশোধে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়েছে। এটা রাজস্ব পরিসরকে সঙ্কুচিত করছে। আমরা দেশের জন্য এবং জনগণের জন্য অনেক কল্যাণমূলক প্রকল্প ও মৌলিক অবকাঠামোতে ব্যয় করতে পারছি না। তাই আমি মনে করি, আমাদের পুঁজিবাজারকে উন্নত করতে হবে।
তিনটি বিষয়ভিত্তিক অধিবেশন নিয়ে দিনব্যাপী সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অধিবেশনগুলোর মধ্যে ছিল নীতিগত নিশ্চয়তা, বাজারে প্রবেশাধিকার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিয়ে ‘দ্য পলিসি কম্পাস-অ্যাডভান্সিং ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট’, আর্থিক সংস্কার ও বিনিয়োগের গতিশীলতা নিয়ে ‘ক্যাপিটাল ফর গ্রোথ-ফিন্যান্স, কমার্স অ্যান্ড ট্রেড’ এবং উদীয়মান খাত ও অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের সুযোগ নিয়ে ‘দ্য নিউ স্টেজ-গভর্নমেন্ট পলিসি, এআই, ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড স্পোর্ট। নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যকার সম্পর্ককে জোরদার করা, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে শক্তিশালী করা এবং টেকসই বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে আরো মজবুত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা ছিল এই সম্মেলনের লক্ষ্য।



