এরশাদ আলী, খুলনা ব্যুরো
খুলনা মহানগরী এলাকার খুনসহ নানা সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) গতকাল শেষ হওয়া দুই সপ্তাহের বিশেষ অভিযান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে কেএমপির হরিণটানা থানা এলাকায় দুপুরে একজন ব্যবসায়ী বিএনপি নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় সেটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। সেজন্যে কেএমপি আটক লোকজনের আদালত থেকে জামিন পেয়ে যাওয়াকে দুষছেন। অপরপক্ষে আদালত সূত্রানুযায়ী, পুলিশ যে দুর্বল মামলায় চালান দিচ্ছে তাতে আসামি বেশিদিন আটকে রাখা যায় না।
খুলনার সন্ত্রাসের বিস্তার অনেক আগে থেকেই। বিশেষ করে গত দুই দশকেরও বেশি আগে কমিউনিস্ট পার্টির নামে তপন, মৃণাল, কামরুল ইত্যাদি বাহিনীর হত্যা, ঘের দখল এবং চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে খুলনার মানুষ বিভীষিকার মধ্যে দিনযাপন করত। অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং পরবর্তীতে র্যাবের তৎপরতায় সে অবস্থার অবসান হলেও অপরাধে জড়িতরা সবাই মারা যায়নি বা অভ্যাস ত্যাগ করেনি। ফলে চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার শিথিলতার সুযোগে সন্ত্রাসীরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুন, ভাড়ায় খুন, অস্ত্র ব্যবসা, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ভূমি দস্যুতার মতো অপরাধ করছে। কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর কথিত বাহিনীতে যোগ দিয়ে অপরাধীরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র মতে, বর্তমানে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় ওপরে রয়েছে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর নাম। নগরীর শামসুর রহমান রোডের বাসিন্দা গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে কেএমপির বিভিন্ন থানায় প্রায় ২০টির মতো মামলা রয়েছে। তার বাহিনীই বড়। মামলায় শাস্তিপ্রাপ্ত বাবু দেশের বাইরে বসে তার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে বলে পুলিশের একটি বিশ^স্ত সূত্র জানায়।
এরপরে আসে পলাশ বাহিনী। নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারের বাসিন্দা পলাশ শেখের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১৯ মামলার রেকর্ড রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে পলাশ বাহিনীর ব্যাপক দাপট ছিল। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ফের দোর্দণ্ড দাপটে সক্রিয় হয়েছে পলাশ। এ ছাড়া আছে নগরীর টুটপাড়া ইস্ট সার্কুলার রোডের বাসিন্দা শানু মুহুরীর ছেলে নূর আজিমের বাহিনী। কিশোর গ্যাং সৃষ্টির মাধ্যমে ২০১৬ সালে সে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। আশিক বাহিনীর প্রধান আশিক ২০১৮ সালে ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম হত্যা মামলায় জড়িয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত হয়। নগরীর মহেশ্বরপাশা এলাকার হুমায়ুন কবীর ওরফে হুমার ছিল বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান গাজী কামরুলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। নগরীর দৌলতপুর দেয়ানা বাউন্ডারি রোডের বাসিন্দা কবির হোসেনের ছেলে আরমিন ওরফে আলামিনের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। তিনিও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য।
বিভিন্ন অপরাধ, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বৃদ্ধিতে চাপের মুখে কেএমপি গত ১ জুন থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করে। গতকাল ছিল অভিযানের শেষ দিন। কেএমপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত অভিযানে আটক করা হয় ৫২৭ জনকে। এর মধ্যে সন্ত্রাসী বলতে হরিণটানা থানার ইমন মোল্লা, সোনাডাঙ্গা থানার সন্ত্রাসী রনি শেখ ওরফে কাবা, গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্য নূর আলম ইসলাম ওরফে নূরুসহ মাত্র কয়েকজন আটক হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের মামলা দেয়া হয়েছে জানতে চাইলে কেএমপির সহকারী কমিশনার (ক্রাইম) ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোহাম্মদ বলেন, থানা থেকে মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়। আমরা এখনো কতজনকে কি মামলায় আসামি করা হয়েছে তার তালিকা করিনি। তবে অপারেশনের শেষে হয়তো তালিকা করা হবে।
অন্য দিকে মেট্রোপলিটন আদালতে খোঁজ নিলে একটি সূত্র জানায়, তাদের অধিকাংশকেই কেএমপি আইনে মামলা দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। সেসব মামলায় দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়া ছাড়া আদালত আইনানুযায়ী আর কিছু করতে পারে না।
এ বিষয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা একান্তে বলেন, আমরা সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আটক করছি। কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। এক-দুই সপ্তাহ বা মাস তারা হাজতে থাকবে, তারপর বেরিয়ে আসবে। এভাবে ব্যাপক আটকের আর একটা নেতিবাচক দিকও আছে। আমরা যেসব ব্যক্তিকে ধরে প্রকাশ্যে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে নিয়ে আসছি, সাধারণ্যে অপরাধী হিসেবে তার গায়ে ছাপ লাগছে। এর কারণে দুই-চারজনের রিহ্যাবিলিটেশনের সম্ভাবনা থাকলেও তার অপমৃত্যু হচ্ছে। তাতে এ অপারেশন বরং অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইন পেশায় যুক্ত কয়েকজনের সাথে কথা বলা হলেও তারা একই ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন।
এ ব্যাপারে কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, আমরা অভিযানে সন্ত্রাসীদের আটকের চেষ্টা করছি। কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে এরা আদালত থেকে খুব দ্রুতই জামিন পেয়ে যায়। অবশ্য আইনও সেরকম। আটক অধিকাংশকেই কেএমপি আইনে আদালতে পাঠানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ওগুলো বখাটে, রাস্তা থেকে ধরা পড়ে।



