আশরাফুল ইসলাম
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ দীর্ঘদিন ধরেই বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ব্যাংক লুটপাট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট, ডলার সঙ্কট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সঙ্কটে পড়েছে। এসব তিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে আবার সচল করতে এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে নীতিসহায়তা জোরদার করেছে। এ বিষয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক সার্কুলার জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে নতুন করে নীতিসহায়তার জন্য আবেদন করা যাবে। তবে, ইতোমধ্যে নীতিসহায়তার আলোকে ঋণ নবায়নের সুবিধা নিয়েছেন তারা নতুন করে নীতিসহায়তা সুবিধা পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো-আর্থিকভাবে তিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া, যাতে তারা ব্যবসা ফের সচল করতে পারে এবং ব্যাংকগুলোও তাদের আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধারের পথ খুঁজে পায়। নতুন নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলোকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়েছে, তবে একই সাথে কিছু কঠোর শর্তও আরোপ করা হয়েছে যাতে অপব্যবহার না ঘটে।
নতুন আবেদন গ্রহণের সময়সীমা বাড়ানো
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, গত বছর জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার ৭ এর আওতায় নীতিসহায়তা পাওয়ার জন্য আগামী ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত নতুন আবেদন জমা দেয়া যাবে। অর্থাৎ তিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো আরো সময় পাচ্ছে তাদের ব্যবসা পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন করার জন্য। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, যেসব ঋণগ্রহীতা এর আগে একই সার্কুলারের আওতায় বা ‘ব্যবসা ও আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ল্েয গঠিত নীতিসহায়তা সংক্রান্ত বাছাই কমিটি’ থেকে ইতোমধ্যে সুবিধা নিয়েছে, তারা আবার আবেদন করতে পারবে না। এর মাধ্যমে একই প্রতিষ্ঠানকে বারবার সুবিধা নেয়ার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।
ঋণের শ্রেণীভেদে বিশেষ সুবিধা
নতুন নির্দেশনায় ঋণের অবস্থাভেদে ভিন্ন ধরনের সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো পুরোপুরি খেলাপি হয়নি, তারা আগেভাগেই পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। একই সাথে পুরনো খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সুযোগ পাবে। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, নতুন আবেদন পাওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। অতীতে অনেক আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে থাকত, ফলে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক-উভয় পই অনিশ্চয়তায় থাকত। এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়ায় প্রক্রিয়াটি আরো গতিশীল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া নীতিসহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট নগদায়নের পর থেকেই তিন মাস গণনা শুরু হবে। তবে ডাউন পেমেন্ট জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত আবেদন কার্যকর হবে না। এ নির্দেশনার ফলে ব্যাংকগুলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে এবং ঋণগ্রহীতারাও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হবে না।
এক্সিট সুবিধা নিয়ে নতুন নির্দেশনা
বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের ৩.৪(ঘ) অনুচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিশেষ এক্সিট সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণগুলোকে এক্সিট (এসএমএ) হিসেবে প্রদর্শন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সাধারণ প্রভিশন সংরণ করতে হবে। একই সাথে বলা হয়েছে, প্রকৃত আদায় ছাড়া এক্সিট সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণের বিপরীতে পূর্বে সংরতি স্পেসিফিক প্রভিশন ব্যাংকের আয় খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সুবিধা দেখিয়ে ব্যাংকগুলো আর মুনাফা বাড়াতে পারবে না। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী তা সাধারণ প্রভিশনে স্থানান্তর করা যাবে। এটি ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদপে হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ অতীতে কিছু ব্যাংক পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সাময়িকভাবে ‘ভালো ঋণ’ হিসেবে দেখিয়ে আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল।
নতুন ঋণসুবিধায় নিষেধাজ্ঞা
বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বলেছে, সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত এক্সিট সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ঋণসুবিধার বাইরে নতুন কোনো ঋণসুবিধা দেয়া যাবে না। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে, পুনর্গঠনের সুযোগ নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন করে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা সৃষ্টি করতে না পারে। এটি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও আরো শক্তিশালী করবে।
কিছু পুরনো নির্দেশনা বাতিল
সর্বশেষ নির্দেশনায় বিআরপিডি সার্কুলার ৭ এর ৪(ঙ) অনুচ্ছেদে আলোচিত নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, ব্যবহারিক জটিলতা ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সার্কুলারের অন্যান্য নির্দেশনা অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাংক খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতিসহায়তা একদিকে যেমন তিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও তাদের আটকে থাকা ঋণ পুনরুদ্ধারের একটি পথ পাবে। বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে অন্তত কিছু ঋণ নিয়মিত ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে অনেক অর্থনীতিবিদ সতর্ক করেছেন, অতিরিক্ত পুনঃতফসিল ও বিশেষ সুবিধা প্রকৃত খেলাপিদের উৎসাহিত করতে পারে। যদি কঠোর নজরদারি না থাকে, তাহলে কিছু বড় ঋণগ্রহীতা বারবার সুবিধা নিয়ে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি আরো বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা মূলত তিগ্রস্ত কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ। এতে ব্যাংকিং খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, ব্যাংকগুলোর দায়িত্বশীলতা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকির ওপর। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এই নীতিসহায়তা দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



