ব্রহ্মপুত্রকে ভারত ও চীন কি রক্ষা করবে না

ডিপ্লোম্যাট বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যৌথ জলরাশি ব্যবস্থাপনার জন্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ না খুঁজে ভারত বাঁধের বদলে বাঁধ নির্মাণের নীতি অনুসরণ করছে। একই সাথে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অথবা যৌথ জলরাশি ব্যবস্থাপনা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চীনকে অববাহিকাব্যাপী বহুপক্ষীয় আলোচনায় যোগ দিতে রাজি করানোর পরিবর্তে তারা অভ্যন্তরীণ একমুখী নীতির দিকে ঝুঁকছে, যা অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং পরিবেশগত অনিশ্চয়তার বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়ারলুং সাংপো-ব্রহ্মপুত্র নদকে ভারত ও চীনের মধ্যে পরবর্তী বড় সঙ্ঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। উজানের আধিপত্যকারী শক্তি হিসেবে চীন ইয়ারলুং সাংপোর উপর জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ করছে, যার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতার গ্রেট বেন্ড প্রকল্প, যাকে প্রায়শই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তবুও, এই বিশাল নদকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে ভারতের পানি-কূটনীতি আশ্চর্যজনকভাবে নিষ্ক্রীয় এবং অনিচ্ছুক।

ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকায় চীন ও ভারত একটি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু স্থবির সম্পর্কে আবদ্ধ। উভয় দেশই তাদের নিজ নিজ ভূখণ্ডের অভিন্ন পানির ওপর ‘স্বত্বাধিকার’ বোধ দিয়ে পরিচালিত হয়। বেইজিংয়ের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশাল ৬০ গিগাওয়াট গ্রেট বেন্ড প্রকল্প থেকে শুরু করে জাংমু ও জিয়াচা বাঁধ এবং ইয়ারলুং সাংপো অববাহিকায় আরো ১৮টি পরিকল্পিত বাঁধ। চীন বিশ্বশক্তির প্রতীক হিসেবে প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়।

বেইজিং ১৯৯৭ সালের জাতিসঙ্ঘ জলধারা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয়। এর জলবিজ্ঞান কৌশলের বৈশিষ্ট্য হলো একতরফা নিয়ন্ত্রণ, তথ্য গোপন করা এবং কখনো কখনো জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্যের ‘অস্ত্রায়ন’। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চীন ২০২২ সাল থেকে ভারতের সাথে জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোনো তথ্য ভাগ করে নেয়নি। এই স্বচ্ছতার অভাব হলো নি¤œ অববাহিকার দেশগুলোর উপর প্রভাব বজায় রাখার জন্য এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’। ২০২০ সালের পর সীমান্ত উত্তেজনা বৃদ্ধির সময়কালে, চীন উজানে তার জবরদস্তিমূলক প্রভাব ব্যবহার করে কার্যকরভাবে জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য আটকে রেখেছিল, যার উপর ভারত বন্যার পূর্বাভাস দেয়ার জন্য নির্ভর করে।

ইয়ারলুং সাংপো-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত হস্তক্ষেপের জবাবে ভারত কিভাবে সাড়া দিয়েছে? যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্তঃসীমান্ত পানি সমস্যা নিয়ে তার পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি সোচ্চার, চীনের সাথে আনুষ্ঠানিক পানি-বণ্টন ব্যবস্থায় খুব কমই অগ্রগতি হয়েছে। মোদি ২০১৫ সালে চীন সফরের সময় ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকায় আরো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি সর্বশেষ জি-২০ সম্মেলনেও বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো বাস্তব ফল পাওয়া যায়নি।

২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদি সরকার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোর প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর বাইরে কূটনৈতিক কাঠামোকে এগিয়ে নেয়নি। পূর্ববর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান তথ্য বিতরণ চুক্তিগুলোকেও উন্নত করেনি। মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি অববাহিকাব্যাপী বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান তৈরিতে নেতৃত্ব দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত।

ফলস্বরূপ চীন-ভারত পানি-কূটনীতি ২০০২ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০০৮, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে নবায়নকৃত জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই এমওইউর মেয়াদ ৫ জুন, ২০২৫-এ শেষ হয়ে গেলেও এখনো নবায়ন করা হয়নি। একইভাবে, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকগুলো ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলোর বাইরে, ভারত সরকার গত দুই দশকে চীনের সাথে কোনো জোরালো জলবিজ্ঞানবিষয়ক কূটনৈতিক সহযোগিতা শুরু করেনি।

উজানে চীনের দুঃসাহসিক কার্যকলাপের প্রতি ভারতের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কূটনীতি নয়, বরং কাঠামোগত আগ্রাসন। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে ২০ হাজার মেগাওয়াট সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্টের (এসইউএমপি) মতো নিজস্ব মেগা-জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দ্রুত গড়ে তোলার মাধ্যমে এবং একাধিক বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধের পরিকল্পনা, চালু বা কার্যকর করার মাধ্যমে নয়াদিল্লি এই আন্তঃসীমান্ত নদীতে তার ‘পূর্বাধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মূল ধারণাটি হলো, চীন জলসম্পদ সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করে এর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের ওপর তার আইনি ও কৌশলগত দাবি প্রতিষ্ঠা করার আগেই ভারত তা দখল করে নেবে।

ভারত সরকারের দাবি, এসইউএমপি (ঝটগচ) নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে, চীনের উজানের বাঁধগুলো থেকে হঠাৎ পানি ছাড়ার কারণে সৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধ করতে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চীনের বাঁধের প্রতিকূল প্রভাব থেকে রক্ষা করতে, রাজ্যের কোষাগারকে সমৃদ্ধ করতে এবং এই অঞ্চলের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎকে বাঁচাতে সাহায্য করবে। কিন্তু এই ধরনের একটি উচ্চাভিলাষী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নদীতীরবর্তী বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়বে।

অরুনাচল প্রদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো এই প্রকল্পগুলো নিয়ে শঙ্কিত, কারণ এগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ‘সম্মতি’ বিবেচনা করা হয়নি। আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো যেখানে সম্পদের অভিশাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে তাদের ‘জাতীয় উন্নয়নের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারত সরকার এই আখ্যানটি ব্যবহার করে ভিন্নমতকে দমনের চেষ্টা করছে এই বলে যে, স্থানীয় প্রতিরোধ কেবল চীনকেই লাভবান করে। ব্রহ্মপুত্র যেন অবিশ্বাসের নদ হয়ে না থাকে, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তার অন্বেষণ তাদের কণ্ঠস্বরকে ক্রমাগত চাপা দিয়ে চলেছে, যারা এই নদীকে তাদের জীবনরেখা এবং এর তীরকে নিজেদের ঘর বলে মনে করে।

যদিও চীনের বাঁধ নির্মাণকার্যক্রম ভাটির অঞ্চলগুলোর জন্য হুমকি হয়ে চলেছে, ভারত সরকার চীনের ‘রান-অব-দ্য-রিভার’ প্রকল্পগুলোকে ভাটির জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকিস্বরূপ নয় বলে বর্ণনা করছে এবং যুক্তি দিচ্ছে যে এই বাঁধগুলো নদীর মোট প্রবাহে কোনো পরিবর্তন আনবে না। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এতে একমত হয়ে বলেছেন, তিনি উদ্বেগের কোনো কারণ দেখছেন না। এর বিপরীতে, অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু চীনের বাঁধগুলোকে ‘টিকিং ওয়াটার বম্ব’ এবং ভাটির মানুষের জন্য একটি ‘অস্তিত্বের সঙ্কট’ বলে অভিহিত করেছেন। তাই, তিনি ভারতের জাতীয় শক্তি ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে এবং স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এসইউএমপিকে সমর্থন করেছেন।

এই বিপরীতধর্মী উদাহরণগুলো দেখায় যে কিভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা চীনের জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত হস্তক্ষেপগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে উপলব্ধি ও চিত্রিত করেন। নির্ভরযোগ্য জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত তথ্যের অভাব রাজনৈতিক নেতাদের দ্ব্যর্থক অবস্থান গ্রহণে সক্ষম করে, যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস তৈরিতে অবদান রাখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর ফলে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় জল-কূটনীতিতে বারবার স্থবিরতা দেখা দেয়। ভারত সরকার বিতর্কিত অঞ্চলে তার বাঁধ নির্মাণকার্যক্রম জোরদার করতে এবং ব্রহ্মপুত্রের ওপর তার প্রথম-ব্যবহারকারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছাকৃতভাবে কূটনৈতিক উদাসীনতা বজায় রাখে।

ব্রহ্মপুত্র একটি বিতর্কিত সীমান্তের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা দু’টি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ দ্বারা প্রতিদ্বন্দ্বিত এবং যারা তীব্র সীমান্ত সঙ্ঘাতে লিপ্ত। অতএব, একটি বাধ্যতামূলক অববাহিকা-স্তরের চুক্তি স্থাপন করা এখন আর কেবল একটি কূটনৈতিক আদর্শ নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং হিমালয়ের পরিবেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। এই অচলাবস্থা ভাঙতে, ভারত সরকারের উচিত সমঝোতা স্মারক এবং বিশেষজ্ঞ-স্তরের বৈঠকের বাইরে গিয়ে কাজ করা, যা ব্রহ্মপুত্রকে সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সামান্যই অগ্রগতি এনেছে।