আজ হাঁড়িভাঙ্গা আম বাজারজাত শুরু

Printed Edition

সরকার মাজকহারুল মান্নান রংপুর ব্যুরো

ভিন্নরকম স্বাদের কারণে ভোক্তাপ্রিয় রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসছে আজ সোমবার (১৫ জুন)। কিন্তু কৃষক-ব্যবসায়ীদের মধ্যে অস্বস্তির শেষ নেই। এক দিকে ফলন কম। অন্য দিকে যে হাট থেকে বেচাবিক্রি হয় হাঁড়িভাঙ্গা, সেই পদাগঞ্জ হাট কাদা পানীতে একাকার। আশপাশের বাইপাস সড়কগুলোও কর্দমাক্ত। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি আছে শুধু কাগজে কলমে। ফলে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না চাষিদের।

হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানী পদাগঞ্জ বাজারের প্রবেশমুখ কর্দমাক্ত। বৃষ্টির কারণে বেচাবিক্রির কোনো পরিবেশ নেই। হাটের মাঠ ছাপিয়ে প্রধান সড়কটির প্রায় দেড়কিলোমিটার জুড়ে হয় বেচাবিক্রি। ড্রেন না থাকায় দুইধারের বেচাবিক্রিতে কাদাময় হয়ে উঠে হাঁড়িভাঙ্গা। অথচ এই হাট থেকেই এবার ৩০০ কোটি টাকার আম বেচাবিক্রির লক্ষমাত্রা কৃষি বিভাগের।

কথা হয় খুচরা পাইকারি অনলাইন ব্যবসায়ী, চাষি লিজি চাষিদের সাথে। তারা তুলে ধরেন হাট এবং আশপাশের রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থার কথা। অনলাইন ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান জানান, ‘আমি অনলাইনে হাঁড়িভাঙ্গা সারা দেশে সেল করি। কিন্তু রংপুর থেকে হাটে আসার প্রধান সড়ক নজিরের হাট-টু পদাগঞ্জ সড়কের অবস্থা বেহাল। আমাদেরকে ঘুরে আসতে হয় ১০ কিলোমিটার। আবার হাটে এসে হাঁটু কাদা। কিভাবে ব্যবসা করব।’

চাষি আমিনুল ইসলাম জানালেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই আম নিয়ে আসা আমাদের কষ্ট হয়। হাটের প্রবেশমুখেই হাঁটু কাদা। যেসব রাস্তা দিয়ে আম আনি সেগুলোও ভালো না। চরম ভোগান্তি করে বেচাবিক্র করা লাগে। যদি ড্রেনেজ সিস্টেম করা যেত তাহলে ভালো হতো। প্রতি বছরই আমরা বলি। কিন্তু কোনো কাজ হয় না।

হাটের প্রবেশ মুখে আরেক চাষি সাজ্জাদ মণ্ডল কাদায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, ভ্যান নিয়ে। তিনি জানালেন, ‘অসুবিধা মানে অনেক অসুবিধা। যদি ড্রেন থাকত তাহলে ভালো হতো। এমনিতেই দাম কম। কাদার কারণে আরো কম দামে আম বিক্রি করা লাগে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান জানালেন, একহাঁটু কাদায় দাঁড়িয়ে আছি আম নিয়ে। সামান্যবৃষ্টি হওয়াতেই এই অবস্থা। সরেজমিন দেখা গেছে দেদার আমের টোল আদায় করা হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আমের মৌসুমে ইজারাদারদের টোল দিতে হয় আরো বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি এবং অনলাইন ব্যবসায়ীরা আসেন। লাখ লাখ টাকা সরকারের রাজস্ব ফান্ডে গেলেও উন্নয়ন হয় না হাটটির। এতে ক্ষুব্ধ সবাই।

ছামিউল ইসলাম নামের একজন চাষি জানালেন, ‘মাল নিয়ে এলে বৃষ্টিতে কাদার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমরা তো নিয়মিত টোল দেই। প্রতি বছর ডিসি সাহেব, ইউএনও সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেব, ইজারাদার আশ্বস্ত করেন। কিন্তু কাজ হয় না।

ঢাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আবু হাসান নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ‘এই হাট থেকে শত শত কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা আম বেচাবিক্রি হয়। কিন্তু হাটটির কোনো উন্নতি হলো না।

অনলাইন ব্যবসায়ী জেসমিন আখতার বলেন, ‘আমি প্রতি বছর এই হাট থেকে ১০০ টনেরও বেশি আম অনলাইনে সরবরাহ করি। কিন্তু হাটে কেনাবেচার কোনো পরিবেশ নেই।

চাষি সাগর মিয়া জানান, ‘হাটের কোনো উন্নতি নাই। রাস্তা এবং প্রবেশমুখ সবখানে কাদা।

লিজি চাষি ফখরুল ইসলাম জানান, ‘ শত শত কোটি কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা আম বেচাবিক্রি হয় পদাগঞ্জ হাট থেকে। এখানে একটা শেড নাই। বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছরং অসুবিধার মধ্যেই স্থানীয় ও বাইরের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আম কিনছেন।

ক্রেতা শাফিউল ইসলাম শাফি জানান, ‘জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে হাঁড়িভাঙ্গা। কিন্তু এটার রফতানির আলোচনা আমরা শুনি না। বাজার ব্যবস্থাপনাও খুব নাজুক। সরকারের উচিত দ্রুত আমটি রফতানির মাধ্যমে চাষিদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা।

তবে হাটের ইজারাদাররা দোষ চাপিয়েছেন ইউএনও ও চেয়ারম্যানের ওপর। এবার ৫৬ লাখ টাকায় ডাক হয়েছে এটি। পার্টনারশিপে ১৬ জন হাটটি ডেকে নিয়েছেন। তাদের একজন মানিক মিয়া।

তিনি জানান, ‘রাস্তার দুইধারে ড্রেন এবং হাটে রাবিশ ও ইট ফেলানোর জন্য আমরা লিখিত আবেদন করেছি- চেয়ারম্যান ও ইউএনও এর কাছে। কিন্তু তারা কোনো ভ্রƒক্ষেপ করছেন না।

এ ব্যপারে মিঠাপুকুরের ইউএনও মো: পারভেজ জানান, ‘হাটটির উন্নয়নের সব দায়িত্ব চেয়ারম্যানের। এ জন্য চেয়ারম্যানকে বরাদ্দে দেয়া হয়। তিনি কেন এ ব্যপারে উদাসীন জানি না। দ্রুত হাটটির সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি।

এক দিকে হাটের এমন দশায় বাজারজাতে অন্তহীন সমস্যা।

অন্য দিকে এপ্রিলের শেষ দিকে শিলাবৃষ্টিতে ৩০-৩৫ ভাগ আম ঝড়ে যাওয়া। বৃষ্টিতে আমের রঙ নষ্ট হওয়া, কালোদাগ পড়া; সাথে ফেটে যাওয়া। সব মিলে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত চাষি ব্যাবসায়ীরা। বৃষ্টির কারণে আমের রঙ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর কাক্সিক্ষত দামও পাচ্ছে না কৃষক।

মণ্ডলপাড়ার আম বাাগানে আম ছিঁড়ছিলেন বাগান মালিক মাহফুজুর রহমান নয়ন। এটা তাদের নিজস্ব বাগান। নিজেরাই আবাদ করেন। তিনি জানান, ‘বাজারটা খুব আপডাউন। এবার ফলন কম হয়েছে। এবার বৃষ্টির কারণে আমের কালারও নাই। সে কারণে বাজারটা ভালো না। প্রকারভেদে ১৪০০ থেকে ১৮০০ এর মধ্যেই বিক্রি করছি। মাহমুদা বেগম নামের এক কৃষাণীর সাথে। তিনি জানান, শিলাবৃষ্টির কারণে ৩০-৩৫ ভাগ আম পড়ে গেছে। ফলনও কম হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কালারও ঠিক থাকছে না। দামও কম করছে। এর আগের বছরগুলোতে এই সময়ে ২৪০০ থেকে ২৮০০ টাকা মণ বিক্রি করেছি। এবার এখনো ১৬০০ টাকা মণ দরেও বিক্রি করতে পারছি না।

কৃষি সম্প্রসারণ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘শিলাবৃষ্টিতে হাঁড়িভাঙ্গা ঝরে পড়লেও ফলন ভালো হয়েছে। আকার বড় হয়েছে। তাই কৃষকরা পুষিয়ে উঠতে পারবেন। এবার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হাঁড়িভাঙ্গা বেচাবিক্রি হবে- যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।’