বাংলাদেশ জ্বালানি সঙ্কটে ১ বিলিয়ন ডলার চাইবে আইএমএফের কাছে

Printed Edition

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

জ্বালানি খাতে বর্ধিত ব্যয় মেটাতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের(আইএমএফ) কাছে অন্ততপক্ষে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বাড়তি সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া বিশ^ব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় এই সহায়তা চাওয়া হবে বলে জানা গেছে। এই সভায় যোগ দেয়ার জন্য আগামীকাল শনিবার ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ দিকে, বাংলাদেশের চাওয়া বর্ধিত ঋণ সহায়তা আইএমএফের পক্ষ থেকে দেয়া হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ আইএমএফের সাথে চলমান এক ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে বেশ কয়েকটি শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই শর্তের মধ্যে ছিল জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি কমানো, টাকার বিনিময় ব্যবস্থা বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, কর আদায়ে সমতা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক মুদ্রানীতি তৈরি করা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং নজরদারি বাড়ানো ইত্যাদি।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এই শর্তের মধ্যে বেশ কয়েকটি শর্ত ইতোমধ্যে পূরণ করেছে। কিন্তু জ¦ালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভতুর্কি কমানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং টাকা বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার শর্ত এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে বিশ^বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে জ¦ালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয় না করা এবং রাজস্ব খাতে সংস্কার বিষয়ে আইএমএফের ঘোরতর অসন্তুষ্টি রয়েছে। এ বিষয়টি তারা আমাদের অবহিতও করেছে। এখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের বৈঠকে যখন বাড়তি সহায়তা চাওয়া হবে তখন সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারে। ব্যাখ্যার সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করছে বাড়তি সহায়তা পাওয়া যাবে কি না।

ইআরডির একটি সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে কী কী বিষয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্তাপন করা হবে তার জন্য একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করা হয়েছে। এই পেপারে দেশের আর্থিক খাতের একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ যে একটি আর্থিক সঙ্কটে আছে সে বিষয়টি আইএমএফের বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে বিশ^বাজারে জ¦ালানি পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে যে আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে তারও একটি চিত্র উপস্থাপন করা হবে বৈঠকে। পরিশেষে এই সব কারণে আর্থিক খাত স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাওয়া হবে।

উল্লেখ্য, আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। আইএমএফের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের সাথে আলোচনা করে তারা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করবে। সম্প্রতি সংস্থাটি ইঙ্গিত দিয়েছে আগামী জুনে তারা ঋণের ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি একবারে ছাড় করতে পারে। তবে সেটা শর্ত পরিপালনের ওপর অনেকটা নির্ভর করছে।

এর আগে, বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরুরি বিদেশী সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। তিনি জানান, ঢাকা বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফিন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো বড় দাতা সংস্থাগুলোর সাথে আলোচনা চালাচ্ছে।

তিনি দাবি করেছেন, জ্বালানি খাতে সহায়তার জন্য বহুপাীয় সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সঙ্কেত পাওয়া যাচ্ছে। এটি আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে। বর্তমান কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করছে সরকার। এ ছাড়া এডিবির বাজেট সহায়তা বাবদ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি আরো ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।