ইউরোভিশন জিতলেন বুলগেরিয়ার দারা

Printed Edition
ইউরোভিশন জিতলেন বুলগেরিয়ার দারা
ইউরোভিশন জিতলেন বুলগেরিয়ার দারা

সাকিবুল হাসান

ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া গানের লড়াইয়ে মাত করে আজ বাজিমাত করেছে বুলগেরিয়ার পপ তারকা দারা। তার সেই তুখোড় নাচের গান ‘বাঙ্গারঙ্গা’ দিয়ে সে জয় করেছে বিচারক আর দর্শকদের মন। টানটান উত্তেজনার শেষে দারা পেছনে ফেলেছে ইসরাইল আর রোমানিয়াকে। ৫১৬ পয়েন্ট ঝুলিতে ভরে বুলগেরিয়া ঘরে তুলেছে তাদের ইতিহাসের প্রথম ইউরোভিশন ট্রফি। লড়াই শুরুর আগে দারার নাম সেভাবে কেউ ভাবেনি ঠিকই, কিন্তু স্টেজে তার সেই মাথা নষ্ট করা নাচ আর কানের ভেতর লেগে থাকার মতো গানের সুর টেক্কা দিয়েছে সবাইকে। বুলগেরিয়ার জন্য এই জয় যেন এক পশলা আনন্দের বৃষ্টি। অন্যদিকে, কপাল পুড়েছে ব্রিটিশ গায়ক ‘লুক মাম নো কম্পিউটার’ এর। তার গান ‘আইনস, জুই, ড্রই’ পেয়েছে লিডারবোর্ডের একদম শেষ জায়গা। বেচারা সারা দুনিয়া খুঁজে জুরিদের কাছ থেকে মাত্র একটি পয়েন্ট পেয়েছে, তা-ও আবার ইউক্রেন দিয়েছে দয়া করে। এই গায়ক অবশ্য হারের আভাস পেয়েছিলেন আগেই। তিনি এই গানকে তুলনা করেছিলেন ‘মারমাইট’ চাটনির সাথে যা হয়তো কেউ খুব ভালোবাসবে, না হয় একদম ঘৃণা করবে। তবে ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার গ্রাহাম নর্টন সান্ত¡না দিয়ে বলেছেন, ছেলেটি চেষ্টা করেছে তার সাধ্যমতো, কিন্তু ইউরোপের মানুষের মন ভেজেনি তাতে। ২০২০ সালের পর এই নিয়ে তিনবার ব্রিটিশরা সবার নিচে নাম লেখাল।

লিডার বোর্ডের শীর্ষ পাঁচ ছিল যারা

১. বুলগেরিয়া : দারা- বাঙ্গারঙ্গা (৫১৬ পয়েন্ট); ২. ইসরায়েল : নোয়াম বেত্তান-মিশেল (৩৪৩ পয়েন্ট);

৩. রোমানিয়া : আলেকজান্দ্রা ক্যাপিটানেস্কু-চোক মি (২৯৬ পয়েন্ট); ৪. অস্ট্রেলিয়া : ডেল্টা গুডরেম-এক্লিপস (২৮৭ পয়েন্ট); ৫. ইতালি : সাল দা ভিঞ্চি -পার সেম্প্রে (২৮১ পয়েন্ট)।

বুলগেরিয়ার এই দারা কিন্তু কম যান না, তিনি নিজের দেশে বিশাল বড় তারকা। তার গানের ভিউ এখন ৮০ কোটির উপরে। ওদিকে তার গানের নাম ‘বাঙ্গারঙ্গা’ শুনে অনেকে অদ্ভুত ভাবলেও, এর আসল মানে হলো জামাইকান ভাষায় ‘হইচই’। নিজের মনের ভয় আর দুশ্চিন্তা কাটিয়ে ওঠার গল্পই দারা বলেছে এই গানে। কুকারি নামের এক প্রাচীন বুলগেরীয় ঐতিহ্যের আদলে সে সাজিয়েছিল তার নাচ। এই নাচের জোরেই সে পেয়েছে সেরা স্টেজ পারফরম্যান্সের পুরস্কার। এমনকি খোদ ব্রিটিশরাও মন খুলে ভোট দিয়েছে এই বুলগেরীয় কন্যাকে। তবে এই ঝকঝকে আসরের ওপর ছিল যুদ্ধের কালো ছায়া। গাজা যুদ্ধে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর প্রতিবাদে ইসরাইলের অংশগ্রহণ নিয়ে সরব ছিল অনেকেই। স্পেন, আয়ারল্যান্ডসহ পাঁচটি দেশ তো এই অনুষ্ঠান বয়কটই করে দিয়েছিল। ভিয়েনার রাজপথে হয়েছে বিশাল বিক্ষোভ। ইসরাইলি গায়ক নোয়াম বেত্তান যখন গান গাইতে উঠলেন, সবাই ভেবেছিল কোনো হাঙ্গামা হবে। সেমিফাইনালে তাকে নিয়ে দুয়োধ্বনি হলেও ফাইনালে অবশ্য তার প্রেমের গান ‘মিশেল’ শান্তিতেই শেষ হয়েছে এবং সে দ্বিতীয় হয়েছে।

চেক প্রজাতন্ত্রের বেলায় আবার ঘটল আজব কাণ্ড। যান্ত্রিক গোলের কারণে গায়ক দানিয়েল স্ক্রিন থেকে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন। পরে সে আবার গাইতে চাইলেও আয়োজকরা তাকে পাত্তা দেয়নি।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, যারা জেতার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল, তারা ছিটকে গেছে প্রথম তিনের বাইরে। ফিনল্যান্ডের জুটি ‘লিকিনহেইটিন’ গান দিয়ে আগুন জ্বালানোর কথা বললেও বাস্তবে তারা ছিল একদম পানসে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার ডেল্টা গুডরেম বিয়ন্সের স্টাইল ধার করে বিশাল মঞ্চে উঠে গাইলেও গানটা পুরনো মনে হওয়ায় সে হয়েছে চতুর্থ।

গানের এই মহা আসর এবার বসেছিল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে। গতবারের জয়ী জেজের গান দিয়ে শুরু হয়েছিল অনুষ্ঠান। ডেনমার্কের গায়ক যখন প্লাস্টিকের বাক্সের ভেতর নেচেকুঁদে অস্থির হচ্ছিলেন, তখনই বোঝা গিয়েছিল রাতটা হবে উন্মাদনার। জার্মানি থেকে নরওয়ে, সব দেশের গানের কথায় ছিল আদিম ভালোবাসা আর পাওয়ার আকাক্সক্ষা। সবাই যে শুধু চিল্লাপাল্লা করেছে তা কিন্তু নয়। ইতালির সাল দা ভিঞ্চি তার স্ত্রীকে নিয়ে গেয়েছেন দারুণ এক রোমান্টিক গান। আর গ্রিসের গায়ক আকাইলাস তো স্টেজেই ব্যাংক ডাকাতি আর গ্রিক মূর্তির সাথে নেচে একাকার করে দিয়েছেন। এর পেছনে অবশ্য ছিল তার মা-বাবার অভাব মেটানোর এক আবেগী গল্প।

আশির দশকের রোবট সেজে রূপালী রঙ মেখে এসেছিলেন লিথুয়ানিয়ার লায়ন সেকাহ। ক্রোয়েশীয় ব্যান্ড লেলেক আবার মুখে প্রাচীন যুদ্ধ সাজ মেখে গেয়েছেন ফেলে আসা দিনের বীরত্বের গান।

এবারের আয়োজন ছিল আরও বিশেষ, কারণ ইউরোভিশন পা দিল ৭০ বছরে। ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া এই আসরের জন্মদিন পালন করতে হাজির হয়েছিলেন পুরনো সব বিজয়ীরা। তারা আগের নামকরা সব গান গেয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন গোটা ভিয়েনা।

অনুষ্ঠানটি শেষ হয় ১৯৫৮ সালের সেই বিখ্যাত ইতালীয় গান দিয়ে, যা একসময় আমেরিকার টপ চার্টেও ছিল। এবারের গানগুলো সেই রেকর্ড ভাঙতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন চলছে জোর আলোচনা। আগামী বছর এই গানের মেলা বসবে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়াতে।