নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করে আসছে যে ইরানের সামরিক শক্তি ‘গুঁড়িয়ে দেয়া’ হয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের একটি গোপন মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা- এখনো বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রয়েছে ইরানের। গত মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, চলতি মে মাসের শুরুতে তৈরি ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরান তার বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কার্যক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর পাশে অবস্থিত ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গোপন প্রতিবেদনের তথ্য জানেন এমন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার আগের তুলনায় বর্তমানে ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ ও ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণ যন্ত্র (মোবাইল লঞ্চার) অক্ষত রয়েছে। এ ছাড়া ইরানজুড়ে মাটির নিচে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ ও উৎক্ষেপণ ঘাঁটির প্রায় ৯০ শতাংশই এখন ‘আংশিক বা পুরোপুরি সচল’।
এই তথ্যগুলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য বক্তব্যকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুদ্ধ শুরুর ১০ দিন পর, গত ৯ মার্চ ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে বলেছিলেন, ইরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে’ এবং সামরিক অর্থে দেশটির ‘আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ ৮ এপ্রিল পেন্টাগনের সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ ঘোষণা করেছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘ধ্বংস করে দিয়েছে’ এবং ‘বহু বছরের জন্য যুদ্ধ অকার্যকর’ করে ফেলেছে। কিন্তু সেই সংবাদ সম্মেলনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অবশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের আগের অবস্থান পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে’ এবং ইরান সরকার জানে যে তাদের ‘বর্তমান পরিস্থিতি টেকসই নয়।’ তার মতে, যারা ভাবছেন ইরান আবার সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করেছে, তারা হয় ‘বিভ্রান্তিতে’ আছেন, নয়তো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পসের ‘মুখপাত্র’।
উল্লেখ্য, হামলা চলাকালে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সংবেদনশীল ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে কমপক্ষে ১০০টি ধাপে ধারাবাহিক পাল্টা হামলা চালিয়েছে। নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন ইঙ্গিত দিচ্ছে, ট্রাম্প ও তার সামরিক উপদেষ্টারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী ছিলেন এবং ইরানের দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে খাটো করে দেখেছিলেন। গত মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন ইরান যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করতে পারে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন পোস্টও গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে জানায়, ইরান তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এবং যুদ্ধপূর্ব মজুদের প্রায় ৭০ শতাংশ ধরে রেখেছে।
এ দিকে ইরান হামলায় মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারে ব্যাপক টান পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর, প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং এটিএসিএএমএস-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয় করে ফেলেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে আমেরিকা তাদের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ এবং প্যাট্রিয়ট ও থাড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করে ফেলেছে। পেন্টাগনের এই মজুদ পুনরায় ভরতে অন্তত এক থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কৌশলগত এই সঙ্কটের আরেকটি কারণ হলো, কঠোরভাবে সুরক্ষিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলার সময় পেন্টাগনের হাতে বাঙ্কার-বাস্টার অস্ত্রের মজুদ সীমিত ছিল। ফলে পুরো স্থাপনা ধ্বংস না করে অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্রবেশপথ সিল করার কৌশল নেয়া হয়, যার ফলাফল হয়েছে মিশ্র।
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মনোযোগ ও অস্ত্রভাণ্ডার আটকে পড়ায় এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সুযোগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। এতে চীনের কৌশলগত সুবিধা আরো বাড়ছে। অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও রাডার তৈরিতে প্রয়োজনীয় গ্যালিয়াম, অ্যান্টিমনি ও বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট) সরবরাহে বিশ্ববাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বেইজিং। ফলে নিজের সামরিক শক্তি পুনর্গঠনে আমেরিকাকে পরোক্ষভাবে চীনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরের মতো উত্তপ্ত ইস্যুতে এই অস্ত্র সঙ্কটের প্রভাব পড়তে পারে এবং বেইজিং এই দুর্বলতাকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে কাজে লাগাতে পারে।



