নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নথিপত্র দুবাইয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের উপপরিচালক ( জনসংযোগ) মো: আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে মামলার সব নথিপত্র তৈরির প্রস্তুতি চলছে। দুর্নীতির এসব নথিপত্র চূড়ান্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো হবে কূটনৈতিক চ্যানেলে।
দুর্নীতি মামলার আসামি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আবুধাবিস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। সেখান থেকে বাংলাদেশের এনসিবিকে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এনসিবি আবুধাবি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।
চিঠিতে এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, ইউএইর ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নম্বর ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চেয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠাতে হবে। আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণ আবেদনের সাথে আরবি ভাষায় অনূদিত, যথাযথ কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত নিম্নোক্ত তথ্য ও নথি সংযুক্ত করতে হবে।
যার মধ্যে রয়েছে- প্রত্যর্পণযোগ্য ব্যক্তির নাম, পরিচয়, ছবি (যদি থাকে), জাতীয়তা, ঠিকানা এবং পরিচয় শনাক্তে সহায়ক অন্যান্য তথ্য, অভিযুক্ত অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, নির্ধারিত শাস্তি এবং তামাদি-সংক্রান্ত বিধানের অনুলিপি, অনুরোধকারী দেশের বিচারিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলার বিস্তারিত বিবরণ, যেখানে অপরাধের প্রকৃতি, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং অপরাধ সংঘটনের স্থান উল্লেখ থাকবে। তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি সংযুক্ত করতে হবে, দণ্ডিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আদালতের রায় বা দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি, অপরাধের বিবরণ, আরোপিত শাস্তি এবং রায় কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র ইত্যাদি।
২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। দুদকের দুই মামলায় তদন্তে আদালতের নির্দেশনায় ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যুর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়।
মামলার মধ্যে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলা রয়েছে। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এই মামলার বাদি দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিনের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ ইস্যু করা হয়।
দুদক সূত্রে জানা যায়, দুদকের অনুসন্ধানকালে বেনজীরকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ দেয়া হলে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট দুদকে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও পাঁচ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন। তবে তদন্তে দেখা যায়, বেনজীর আহমেদ তার ঘোষণাকৃত সম্পদের মধ্যে দুই কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ হাজার টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। যা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদকের কাছে প্রমাণিত হওয়ায় ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
অন্য দিকে, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
বেনজীর ছাড়া বাকি আসামিরা হলেন, পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক ও বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, বেনজীর আহমেদ ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর ডিআইজি হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় হাতে লেখা পাসপোর্ট সমর্পণ করে বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত অফিসিয়াল মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের (এমআরপি) জন্য আবেদন করেন। আবেদন ফরমে ‘অফিসিয়াল’ হিসেবে মার্ক করা হয়। তার আবেদনপত্রের প্রফেশনের ক্রমিকে সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে প্রাইভেট সার্ভিস উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায়ও পাসপোর্টের আবেদনপত্রে জালিয়াতি-প্রতারণা, অপরাধমূলক অসদাচরণ ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করেন। অন্যান্য সময়েও বিভাগীয় অনাপত্তিপত্র ব্যতীত মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি)/ই-পাসপোর্টের (ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট) জন্য আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট অধিদফতরের আসামিরা বেনজীর আহমেদের দাফতরিক পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জ্ঞাত থেকেও অন্যান্য আসামিরা বিভাগীয় অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ না করে কিংবা যাচাই না করে স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে তার নামে সাধারণ পাসপোর্ট কিংবা ই-পাসপোর্ট ইস্যুর চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩ এর ১১ ধারায় অপরাধ করেছেন।
বেনজীরের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকারও বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিং মিলিয়ে মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ অঢেল সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দুবাইতে থাকা দু’টি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করে সংস্থাটি।
২০২০ সালে ৩০তম আইজিপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীর প্রধান পদে দায়িত্ব নেন বেনজীর আহমেদ। নিয়মানুযায়ী সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু বেনজীর মর্যাদাপূর্ণ লাল পাসপোর্টও নেননি। আইজিপি হয়েও তিনি ফের বেসরকারি চাকরিজীবী পরিচয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করেন। সে সময় দেশে চালু হয় ই-পাসপোর্ট।
বেনজীরের আবেদন নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। তা সমাধান করতে তিনি আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে যাননি। অসুস্থতার কথা বলে পাসপোর্টের ডিআইপির মোবাইল ইউনিট চেয়ে পাঠান। পরে পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তার বাসায় গিয়ে ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেয়াসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ২০২০ সালের ৪ মার্চ তার আবেদনপত্র জমা হয়ে যায়। ওই বছরের ১ জুন বেনজীরের নামে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তদন্তে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখনই তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।



