ক্ষমতাকে প্রশ্ন করলেই ‘ট্যাগিং’ ও হামলা
খুন-সহিংসতায় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় কার্যকর পরিকল্পনা নেই
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে মাত্র কয়েক মাস হলো। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার নাটকীয় অবসান এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় এটি নিয়ে দেশ-বিদেশে ছিল ব্যাপক কৌতূহল। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী এই নতুন বাংলাদেশে একটি ভিন্ন চিত্র এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে-নতুন ভোটার ও তরুণদের একটি বড় অংশের দলীয় রাজনীতির প্রতি তীব্র অনীহা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় সাড়ে চার কোটিই ছিলেন তরুণ ও নতুন ভোটার। ভোটের আগে কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো এই তরুণদের অংশগ্রহণকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ‘আলোকবর্তিকা’ বলে উল্লেখ করেছিল। তবে ভোটের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শহরাঞ্চলের তরুণদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, তাদের একটি বড় অংশ সরাসরি দলীয় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তারা চায়ের টেবিলে রাজনীতি নিয়ে গভীর আলোচনা-সমালোচনা করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো মতামত দিচ্ছে, কিন্তু কোনো দলের কর্মী বা সমর্থক হিসেবে সরাসরি যুক্ত হতে চাইছে না।
নির্বাচন-উত্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তরুণদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে কর্মসংস্থান, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতি, খুন-ধর্ষণের বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। তরুণদের ফেসবুক পোস্ট, মন্তব্য ও বিভিন্ন গ্রুপ ডিসকাশনে স্পষ্ট যে, তারা এখন আর কোনো দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্ধ ভক্ত হতে রাজি নয়; তারা দেখতে চায় নীতি ও বাস্তব ফলাফল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান স্পষ্ট ভাষায় নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা পুরনো ও নতুন দুই পক্ষকেই দেখছি। এখন আর ফাঁকা কথা শুনতে চাই না, আমরা কাজ দেখতে চাই।’
একই সুর শোনা গেল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতি ঘৃণা করি না। আমরা খারাপ ও নোংরা রাজনীতি পছন্দ করি না।’
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সবাই চাকরির কথা বলেছিল, বাজেটে বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ব্যাচের অর্ধেক এখনো বেকার। তাই আস্থাটা নষ্ট হয়ে গেছে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তরুণদের এই মনস্তত্ত্বের পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে-
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা : গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে তৈরি হওয়া সঙ্ঘাত ও অবিশ্বাসের আবহে এই তরুণরা বড় হয়েছে। তাদের কাছে রাজনীতির সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছিল সংঘর্ষ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে দমনের চিত্র। ফলে রাজনীতিকে তারা ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে সহজে বিশ্বাস করতে পারছে না।
অর্থনৈতিক চাপ ও বেকারত্ব : বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বের হওয়ার পরও চাকরি না পাওয়া, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দলগুলো ক্ষমতার বাইরে থাকতে কর্মসংস্থানের হাজারো প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন মিলছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব : আগে রাজনৈতিক তথ্যের প্রধান উৎস ছিল দলীয় প্রচার বা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম। এখন ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম তরুণদের প্রধান তথ্যসূত্র। এখানে তারা বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা ও গঠনমূলক সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি ও ছাত্রসংগঠনের আধিপত্যের লড়াই
নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ দেখে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলীয় কাঠামোর বাইরে এসে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের দাবিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল। তারা ভেবেছিল, নতুন বাংলাদেশে হয়তো লেজুড়বৃত্তি ও দখলদারিত্বের ছাত্ররাজনীতি থেকে ক্যাম্পাসগুলো মুক্তি পাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল) এবং অন্য প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে দফায় দফায় মারামারি, হল দখল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতা সবচেয়ে বেশি রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক অস্ত্র-‘ট্যাগিং’ বা তকমা দেয়ার সংস্কৃতি। ক্যাম্পাসে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী যদি প্রশাসনের কোনো ভুল সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে বা নতুন ব্যবস্থার সমালোচনা করে, তবে তাকে মুহূর্তের মধ্যে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ বা ‘গুপ্ত এজেন্ট’ বলে ট্যাগ করে দেয়া হচ্ছে। এই ট্যাগিংয়ের আড়ালে চলছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, হল থেকে বের করে দেয়া এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ‘নাগরিক কর্মী’ বা ‘সামাজিক কর্মী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর এই চণ্ডনীতির কারণে ক্যাম্পাসে স্বাধীন মতপ্রকাশের জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে।
নতুন বাজেট ২০২৬-২৭ : তরুণদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে উত্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট নিয়ে দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ছিল। সরকার এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিলেও সাধারণ তরুণদের মধ্যে এটি নিয়ে সংশয় কাটেনি।
তরুণদের অভিযোগ, বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা খাতের গুণগত মানোন্নয়নে যে ধরনের বৈপ্লবিক বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল, তা অনুপস্থিত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে সাধারণ পরিবারের তরুণদের ওপর যে অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে, তা নিরসনে সুনির্দিষ্ট কোনো রোডম্যাপ বাজেটে নেই। জাতীয় সংসদেও কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার, নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় আলোচনা হচ্ছে না বলে মনে করছেন তরুণ ভোটাররা।
রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি: পরিসংখ্যান কী বলে?
নির্বাচনের পর দেশের তরুণ সমাজ ভেবেছিল হয়তো তাদের আর গুম, খুন ও রাজনৈতিক সহিংসতার চেনা ও ভয়ঙ্কর চিত্র দেখতে হবে না। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও রাজনৈতিক সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭০০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অন্তত ১২ জন নিহত এবং দুই হাজার ৬০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মার্চ মাসেই নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় আরো ১৮ জন নিহত এবং ৯১২ জনের বেশি আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। মে মাসে আবার ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংস ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সহিংস অপরাধে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এ সময়ে ৬০০-এর বেশি হত্যাকাণ্ড, শতাধিক অপহরণ এবং বহু ছিনতাই ও সহিংস ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। যদিও সব ঘটনাই সরাসরি রাজনৈতিক নয়, তবে রাজনৈতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ বলেন, ‘রাজনীতির চেয়ে এখন বড় ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তাহীনতা। খুন-গুমের খবর শুনলে মনে হয়, রাষ্ট্র আমাদের সুরক্ষা দিতে পারছে না।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী ফারদিনা জেরিন বলেন, ‘আমরা ভোট দিই ভবিষ্যৎ বদলানোর জন্য, কিন্তু ধর্ষণ বা সহিংসতার বিচার কতটা দ্রুত হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা মেহজাবিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরও নিরাপদ বোধ করি না। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির খবর শুনলে মনে হয়, শুধু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।’
বাংলাদেশের রাজনীতির এই ক্রান্তিকাল এবং তরুণদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষক ও গবেষকরা গভীর উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব কায়সার নয়া দিগন্তকে বলেন, তরুণদের এই অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একই সাথে বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন আর দলকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিতে আস্থা রাখতে পারছে না। তারা ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ সমর্থনের পরিবর্তে জবাবদিহি, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দেখতে চায়। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণরা যে মৌলিক পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিল, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা ও অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। যদি এই তরুণদের বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে ভবিষ্যতে দেশে তীব্র নেতৃত্বের সঙ্কট তৈরি হতে পারে। কারণ গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সুস্থ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।’
নতুন সরকারের কার্যক্রম ও সার্বিক সুশাসন নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ (যেমন-সরকারি প্লট বা শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা না নেয়া, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার করা) দেখা গেলেও জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোনো রোডম্যাপের অভাব রয়েছে। জনগণ যে সুশাসনভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিল, সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ ও দলের বিভিন্ন স্তরে ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মানসিকতা সেই প্রত্যাশার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মার্চ-এপ্রিল সময়ে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ও ১৯৬টি অপহরণের মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে, পলিটিক্যাল চেঞ্জের পরও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।’
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক নির্বাচনী বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জেন-জি (এবহ-ত) ভোটারদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল- যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, সুশাসন এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও কর্মসংস্থান সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের তীব্র চাপ এবং রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে।
নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সন্ধানে
নীতিনির্ধারক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ‘রাজনীতিবিমুখতা’ এবং ‘রাজনৈতিক সচেতনতা’ এই দু’টি বিপরীতমুখী প্রবণতা একই সাথে সমান্তরালে কাজ করছে। অতীতে রাজনীতিবিমুখতা বলতে বোঝাত রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে চরম উদাসীনতা। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের তরুণেরা দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও রাষ্ট্রীয় নীতি, নির্বাচন, মানবাধিকার ও অর্থনীতি নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে চায় না, কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে নিজেদের অংশীদারিত্ব চায়। এটি মূলত এক ধরনের নতুন ও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে দলের চেয়ে ‘পলিসি’ বা নীতি বেশি গুরুত্ব পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকি নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির খোলস ভাঙার চেষ্টা চলছে, অন্য দিকে নতুন প্রজন্ম নিজেদের মতো করে একটি জবাবদিহিমূলক অবস্থান তৈরি করছে। তারা আর কোনো দলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে রাজি নয়, আবার দেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ চলেও যেতে চায় না। তাদের চাওয়া অত্যন্ত সাধারণ ও যৌক্তিক-সৎ নেতৃত্ব, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, কর্মসংস্থান, নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।’
২০২৬ সালের নির্বাচন শেষ হয়েছে, গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। কিন্তু নতুন ভোটারদের মনে যে মৌলিক প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছে, সেগুলোর উত্তর এখনো অধরাই রয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো যদি তরুণদের এই যৌক্তিক প্রত্যাশার সঠিক উত্তর দিতে না পারে, তবে রাজনীতির প্রতি এই অনাস্থা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আর যদি দলগুলো নিজেদের শুধরে নিতে পারে, তবে আজকের এই ‘রাজনীতিবিমুখ’ তরুণরাই হয়তো আগামী দিনে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।



