লাইসেন্স বাতিল হলো আদ্-দ্বীন হাসপাতালের

Printed Edition
রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর পুলিশ মোতায়েন করা হয় : নয়া দিগন্ত
রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর পুলিশ মোতায়েন করা হয় : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুমে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। গত ৯ জুন আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানো নোটিশের যে জবাব প্রদান করে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সন্তোষজনক না হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালক ডা: আবু হোসেন মো: মঈনুল আহসান গতকাল বৃহস্পতিবার মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদফতরে প্রেস ব্রিফিংয়ে এই সিদ্ধান্ত জানান। দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২ এর ১১ (২) (খ) ধারা অনুযায়ী আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আদ্-দ্বীন হাসপাতালে আর কোনো রোগীর সেবা দেয়া যাবে না। হাসপাতালে বর্তমানে যে রোগী আছে এর কী হবে, এটা নিয়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালক অবশ্য কোনো কথা বলেননি।

আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে সরকার সন্তুষ্ট নয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন বকুল সাংবাদিকদের গত বুধবারই জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আদ্-দ্বীনের বক্তব্য অস্পষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালক আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের এই সিদ্ধান্তই জানিয়ে দিয়েছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ত্রুটি, পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের গাফিলতির একাধিক দিক উঠে এসেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে। তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডটি নবজাতক ও অস্ত্রোপচার পরবর্তী (পোস্ট অপারেটিভ) রোগীদের জন্য উপযুক্ত ছিল না। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব ছিল এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপ্রতুল ও অনিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। এ ছাড়া ওই ঘটনার সময় ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না এবং গুরুতর অবস্থার পরও সময়মতো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। সরকারি তদন্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়, জন্মের পর নবজাতকদের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল এবং তাদের বিশেষ চিকিৎসা বা ইনকিউবেটরের প্রয়োজন ছিল না। তবে হঠাৎ অবস্থার অবনতি হলেও জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পাশাপাশি হাসপাতালের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব এবং প্রশাসনিক ত্রুটির বিষয়টিও সরকারি তদন্ত রিপোর্টে তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, গত ২৭ মে সকাল ১০টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে পোস্ট অপারেটিভ রুমে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। গত ৪ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়া হয় এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করে ৭ জুনের মধ্যে এর জবাব দানের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ আরো দুই দিনের সময় চেয়ে আবেদন করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৯ জুনের মধ্যে জবাবদানের সময় নির্ধারণ করে, তারা সেই মোতাবেক জবাব দেয়। সর্বশেষ গতকাল ১১ জুন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল অন্যায্য : ইসলামী আন্দোলন

স্বাস্থ্যসেবায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের অবদান সর্বজন স্বীকৃত উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করার সরকারি সিদ্ধান্তকে অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য বলে দাবি করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, গত ঈদুল আজহার আগের দিন মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যু দেশের অন্য সবার মতো আমাদেরকেও ব্যথিত করেছে। এমন দুর্ঘটনার পর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া এবং তদন্তে যাদের দায় বা কর্তব্যে অবহেলা পাওয়া যাবে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা থাকলে তাও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসা উচিত। কিন্তু এর জেরে একটি প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কাম্য বা ন্যায্য নয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তে যাদের দায় পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুন এবং হাসপাতালের কোনো ত্রুটি থাকলে জরিমানা করা যেতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আদ্-দ্বীনের মতো একটি জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।

বিবৃতিতে মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের চিত্র তুলে ধরে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সর্বত্র অরাজকতা বিরাজ করছে। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল মানসম্মত সেবা দেয় না, আর যারা দেয় তারা মাত্রাতিরিক্ত ফি আদায় করে। ফলে সাধারণ ও নি¤œ আয়ের মানুষের সরকারি হাসপাতালে মানবেতর সেবা গ্রহণ ছাড়া উপায় থাকে না।

এমন বাস্তবতায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি উল্লেখ করেন, ২০০০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্পমূল্যে মানসম্মত সেবা দিয়ে আসছে। বিগত ২৬ বছরে প্রায় দুই কোটি রোগী এখান থেকে সেবা পেয়েছেন।