বিশেষ সংবাদদাতা
মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং ঝুঁকি ও বিনিয়োগ সঙ্কট গভীর হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে হ্রাস পেয়ে ৩.৯ শতাংশ দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ^ব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম নাজুক একটি সময়ে প্রবেশ করছে। ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পতন- সবকিছু মিলে একটি ব্যাপক সামষ্টিক অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করছে। ৩৫ বছরে প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।
বিশ^ব্যাংক মনে করছে, এসব কারণে ২০২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৯ শতাংশে এ নেমে আসবে। যা টানা তৃতীয় বছরের মন্দা এবং গত দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে বাংলাদেশের বজায় রাখা ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে একটি বড় বিচ্যুতি।
বিশ^ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ নিয়ে বিশ^ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. ধ্রুব শর্মা এ কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
বিশ^ব্যাংকের প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক মন্দার পেছনে চারটি প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ক্রমবর্ধমান বাহ্যিক চাপ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির সঙ্কোচন যা ৩৫ বছরে প্রথমবারের মতো রেকর্ড হয়েছে। কৃষি প্রবৃদ্ধিও তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরো দুর্বল করে দিয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, ক্রমবর্ধমান বাহ্যিক অনিশ্চয়তার সময়ে বাংলাদেশের নীতিগত সুরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত।
ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের সাথে সাথে দারিদ্র্য বাড়ছে
অর্থনৈতিক মন্দা ইতোমধ্যেই জীবনযাত্রার মানের অবনতিতে প্রতিফলিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে আনুমানিক আরো ১৪ লাখ মানুষ নতুনভাবে দারিদ্র্যের শিকার হবে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল শ্রম আয় বৃদ্ধি এবং অপর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের কারণে জাতীয় দারিদ্র্য ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত রেমিট্যান্সপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটিয়ে, আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিবারের আয় কমিয়ে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি আরো কমিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৬ অর্থবছরে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যেখানে সঙ্ঘাত-পূর্ববর্তী সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ।
কঠোর মুদ্রানীতি সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৮.৫ শতাংশ, যেখানে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় পণ্যের মুদ্রাস্ফীতিই ক্রমাগত উচ্চ ছিল। মনে করা হচ্ছে চাহিদাজনিত চাপের পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা এবং দুর্নীতিকে মুদ্রাস্ফীতির প্রধান কাঠামোগত চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। একই সাথে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত জুড়ে নি¤œ-আয়ের ও অদক্ষ শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে, যা পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
ব্যাংকিং খাত তীব্র চাপের মধ্যে
প্রতিবেদনটিতে দেশের ব্যাংকিং খাতকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২২টি ব্যাংক বর্তমানে মূলধনের ঘাটতিতে ভুগছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কঠোর ঋণ শ্রেণীবিন্যাস মান প্রবর্তন এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রচেষ্টার ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৬.৮ শতাংশ থেকে কমে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পদ্ধতিগত ঝুঁকি যাতে আরো না বাড়ে, সেজন্য প্রতিবেদনে জরুরি ভিত্তিতে পুনঃমূলধন ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণের দ্রুত নিষ্পত্তি, ব্যাংকগুলোর ওপর শক্তিশালী তদারকি এবং পুনর্গঠন ব্যবস্থাপনার উন্নতির আহ্বান জানানো হয়েছে।
রাজস্ব ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমেছে
যদিও ২০২৫ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি আগের বছরের ৩.৯ শতাংশ থেকে সামান্য কমে জিডিপির ৩.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৬.৯ শতাংশে নেমে এসেছে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ এবং এটি সরকারের রাজস্ব পরিসরকে তীব্রভাবে সঙ্কুচিত করেছে। একই সময়ে, ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি এবং চলমান চলতি ব্যয় টানা দ্বিতীয় বছরের মতো উন্নয়নমূলক ব্যয়কে সঙ্কুচিত করেছে।
২০২৪ অর্থবছরে সরকারি ঋণ জিডিপির ৩৭.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ অর্থবছরে ৩৯.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।



