ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। কিন্তু অতীতে সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে অনেক গণমাধ্যম ক্ষমতাসীনদের তোষামোদে ব্যস্ত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই তোষামোদী সংস্কৃতি থেকে জাতিকে বেরিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা শক্তিশালী হবে না।
গতকাল রোববার রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত ‘জুলাই শহীদ সাংবাদিক সম্মাননা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনইসির সভাপতি ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া পাঁচ সাংবাদিকের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা স্মারক ও এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরপরই যারা রাষ্ট্রের রূপান্তরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার মতে, পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের পথ আরো সুগম হয়। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করা হয়েছে এবং ভিন্নমত দমনে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১৫-১৬ বছরের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের সামনে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে কখনো বিস্মৃত হওয়া যাবে না। শহীদ পরিবারের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে অপরাধী মনে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যম প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, কিন্তু অতীতে অনেকেই সেই ভূমিকা পালন না করে ক্ষমতার প্রশংসায় ব্যস্ত ছিলেন। দুঃখজনকভাবে সেই সংস্কৃতির কিছু অংশ এখনো রয়ে গেছে। তার ভাষায়, তোষামোদ ও মোসাহেবির সংস্কৃতি শুধু গণমাধ্যমেই নয়, রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রেও বিদ্যমান। এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তন।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি কোনো বিপ্লবী দল নয়; এটি একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যা নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে বিশ্বাস করে। তিনি বলেন, দলের ৩১ দফা, জুলাই সনদ এবং জনগণের সাথে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে- যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়নি, সেসব বিষয়ে নির্বাচিত সরকার নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে। অথচ বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্দোলনের পাশাপাশি এখন আলোচনার রাজনীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কারে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাবন্দী হয়েছেন, লাখ লাখ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার ৭০০ নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। শহীদ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকলেও সেগুলো আরো কার্যকর ও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, অল্প সময়ে ১৫ বছরের লুটপাট, ধ্বংস ও অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আস্থা রেখে এগিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অধিকার আদায়ে আর কাউকে জীবন দিতে হবে না এবং মতপার্থক্যের সমাধান হবে আলোচনার মাধ্যমে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, আবার যেন দেশে কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে, সেজন্য জাতিকে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ রাখার লক্ষ্য নিয়েই ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে গণমাধ্যমের একাংশের তোষামোদী ভূমিকার কারণেই ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হয়েছিল। সম্পাদকদের নতুন এই সংগঠন ঢাকার বাইরের সম্পাদকদেরও সমান গুরুত্ব দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
মাহমুদুর রহমান বলেন, সংবাদমাধ্যমের কাজ হচ্ছে প্রশ্ন করা। আমাদের সাংবাদিকদের অধিকার হচ্ছে ‘টু আস্ক কোশ্চেনস’। আমরা এখান থেকে বেরিয়ে আসব না, ইনশাল্লাহ।
এ সময় শহীদ পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার দেশ সম্পাদক বলেন, ‘আমি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এই শহীদরা এই অল্প বয়সের জীবন না দিলে আমরা স্বাধীনতা ফিরে পেতাম না; আমি আমার নির্বাসনজীবন থেকে ফিরে আসতে পারতাম না। আমি আবার আমার দেশ চালু করতে পারতাম না। কাজেই এদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
এ সময় এনইসি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য তুথলে ধরে মাহমুদুর রহমান বথলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা সারা দেশের সব পত্রিকার সম্পাদকদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছি। আমরা এলিটিজম থেকে বের হতে চেয়েছি।’
অতীত অজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা এর আগে এডিটরদের নামে একটা এলিটি ক্লাসের নিয়ন্ত্রণ দেখেছি। আমরা সেখান থেকে চেয়েছি ঢাকার বাইরের সম্পাদকথদের যুক্ত করতে। আর দ্বিতীয় আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আবার যেন কোনো ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠতে না পারে, সেজন্য জাতিকে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ রাখা। এটা আমাদের ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের গোল।’ মাহমুদুর রহমান আরো বলেন, ফ্যাসিবাদের যে উত্থান হয়েছিল, তার পেছনে মিডিয়ারও ভূমিকা ছিল। মিডিয়ার তোষামোদর কারণে ফ্যাসিবাদ এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পেরেছিল। আমার দেশ সম্পাদক বলেন, ‘একটি সমস্যা আমার মনে হয়, আমরা জাতি হিসেবে তোষামোদ ও তোষামোদি পছন্দ করি। অদ্ভুত আমাদের ন্যাশনাল ক্যারেক্টার। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল এই তোষামদতে বিশ্বাস করে না।’
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদ সাংবাদিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জুলাই শহীদদের এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। তিনি তার বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবে শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয় ও মেহেদী হাসানসহ সব শহীদ সাংবাদিকদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি ওয়াদারের সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ের চেতনা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকবে। তিনি ঘোষণা দেন, শহীদ পাঁচ সাংবাদিকের সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় বহনে এনইসি ভবিষ্যতেও সহযোগিতা করবে।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এখনো জাতীয় পর্যায়ে কোনো স্থায়ী স্মারক বা ‘জুলাই শহীদ চত্বর’ নেই। তিনি সরকারের কাছে এমন একটি স্মারক নির্মাণ এবং শহীদ সাংবাদিকদের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান।
শহীদ সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান বলেন, অতীতে গণমাধ্যম যদি ক্ষমতাসীনদের অন্ধ সমর্থন না করত, তাহলে ফ্যাসিবাদ এতটা শক্তিশালী হতে পারত না। তিনি জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন এবং গণমাধ্যমকে ভবিষ্যতে যেকোনো ক্ষমতার তোষামোদ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও জুলাইয়ে শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যরা। শেষে শহীদ সাংবাদিকদের পরিবারের হাতে সম্মাননা স্মারক ও আর্থিক সহায়তা তুলে দেয়া হয়।



