এক হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

চুয়াডাঙ্গায় চাহিদার চেয়ে বেশি ৭১ হাজার গবাদিপ্ত

Printed Edition
দামুড়হুদার একটি পশুর হাট : নয়া দিগন্ত
দামুড়হুদার একটি পশুর হাট : নয়া দিগন্ত

মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গাজুড়ে এখন কোরবানির পশু প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা চলছে। জেলার গ্রাম থেকে গ্রাম, খামার থেকে খামারে গরু-ছাগলের পরিচর্যা, গোসল, খাবার সরবরাহ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। তাদের চোখে এখন একটাই স্বপ্ন- ভালো দামে পশু বিক্রি করে দীর্ঘদিনের শ্রমের মূল্য পাওয়া। তবে সেই স্বপ্নের পাশাপাশি রয়েছে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কাও। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ২৩৯টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ৪৪ হাজার ৩৯৬টি গরু, ১১৬টি মহিষ, ১ লাখ ৫৫ হাজার ২০০টি ছাগল এবং প্রায় আড়াই হাজার ভেড়া। বিপরীতে জেলার সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১৮১টি পশু। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত পশু রয়েছে ৭১ হাজার ৬৬টি পশু। এই বিপুল প্রস্তুতিকে ঘিরে এবার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার চাহিদা পূরণ করেও বিপুলসংখ্যক পশু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দেশীয় ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ করা পশুগুলোর মধ্যে ছোট, মাঝারি ও বড়- সব ধরনের গরুই রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলা- সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগরের খামারিরা কয়েক মাস ধরেই পশু লালন-পালনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পশুর খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে। অনেক খামারে বিশেষ খাদ্যতালিকা, ভিটামিন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।

তবে এবারের মৌসুমে খামারিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র গরম ও লোডশেডিং। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় খামারগুলোতে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালানো, পানি ছিটানো ও ঠাণ্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে বলে জানান খামারিরা।

আলমডাঙ্গা উপজেলার খামারি শাহীন বলেন, প্রতি বছর তিনি ১৫০ থেকে ২০০টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেন। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা তার খামারে আসেন। তিনি বলেন, ‘ভালো জাতের গরু লালন-পালনে অনেক খরচ হয়। কিন্তু এবার অনেক ক্রেতাই কম দাম বলছেন। লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কি না, সেটাই এখন বড় চিন্তা।’

খামারের কর্মী শামসুল আলম বলেন, এবার গরম অনেক বেশি। পশু সুস্থ রাখতে সারাক্ষণ ফ্যান চালাতে হয়েছে, বারবার পানি ছিটাতে হয়েছে। খাবারের দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হয়েছে। এতে শ্রম ও খরচ দুটোই বেড়েছে।

খামারিদের দাবি, পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। অনেকে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে খামার পরিচালনা করছেন। ফলে বাজারে ন্যায্য দাম না পেলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে শাহীওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু পালনের প্রবণতা বেশি। পাশাপাশি জেলার অন্যতম পরিচিত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলেরও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। স্থানীয় খামারিদের আশা, এবারের বাজারে ভালো দাম পেলে আগামী বছর আরো বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণ করবেন তারা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের উপপরিচালক ডা: শামীমুজ্জামান বলেন, জেলার আটটি পশুর হাটে প্রাণিসম্পদ বিভাগের টিম কাজ করছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ কেনাবেচা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের মৌসুমে জেলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার পশু বাণিজ্য হবে।

ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে জেলার পশুর হাট। এখন খামারিদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে বাজারে।