অতীতের গৌরব বুকে নিয়ে টিকে আছে বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি

Printed Edition
অতীতের গৌরব বুকে নিয়ে টিকে আছে বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি
অতীতের গৌরব বুকে নিয়ে টিকে আছে বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি শুধু একটি প্রাচীন স্থাপনা নয়; এটি বাংলার জমিদারি ইতিহাস, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। প্রায় দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ি আজও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করলেও সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, তাড়াশের জমিদার বনওয়ারী লাল রায় নৌভ্রমণের সময় নদীবেষ্টিত সবুজ পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন ফরিদপুর এলাকায় বনওয়ারীনগর প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে জমিদার বনমালী রায় বাহাদুর এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি নামে পরিচিত। চারদিক পরিখাবেষ্টিত, একমাত্র প্রবেশপথবিশিষ্ট এ রাজবাড়ি ইউরোপীয় রেনেসাঁ-শৈলীর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশ সরকারি কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, অফিসার্স ক্লাব, আনসার ও ভিডিপি কার্যালয় এবং উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরি রাজবাড়ির বিভিন্ন ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্থাপনাটি এখনো ব্যবহারযোগ্য থাকলেও এর মূল ঐতিহাসিক চরিত্র সংরক্ষণে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ।

রাজবাড়ির চারপাশের পরিখা, বিশাল প্রাঙ্গণ, প্রাচীন বৃক্ষরাজি ও লাল পদ্মে ভরা জলাশয় এখনো অতীতের ঐশ্বর্যের স্মৃতি বহন করে। চারটি কোরিনথিয়ান স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান এবং দ্বিতীয় তলার বারান্দাসহ ভবনটির স্থাপত্যশৈলী এ অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

বনওয়ারী লাল রায় ও বনমালী রায় বাহাদুর শুধু জমিদারই ছিলেন না; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বনমালী রায় বাহাদুরের উদ্যোগে বনওয়ারীনগরে করনেশন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া পাবনার বনমালী ইনস্টিটিউট, টাউন হল, হাসপাতাল, জগন্নাথ মন্দির এবং অ্যাডওয়ার্ড কলেজের বিজ্ঞানাগার নির্মাণে তার আর্থিক সহায়তা ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। ১৮৯৪ সালে জনকল্যাণমূলক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বনওয়ারীনগর রাজবাড়ি শুধু স্থানীয় ইতিহাসের অংশ নয়; এটি উত্তরবঙ্গের জমিদারি ঐতিহ্য, স্থাপত্যশিল্প ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মূল্যবান দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং পর্যটনবান্ধব উন্নয়ন করা গেলে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় রাজবাড়িটিকে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি। তাদের মতে, অতীতের গৌরবময় ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বনওয়ারীনগর রাজবাড়ির সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।