মনিরুজ্জামান সুমন দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা)
চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারে জামিনপ্রাপ্ত বন্দীদের মুক্তি আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণ এবং কারাগারের ভেতরে মাদক বাণিজ্যের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে কারা অধিদফতর। গত ৫ জুলাই দৈনিক নয়া দিগন্তে ‘জামিনের পর মুক্তি না দিয়ে অর্থ আদায়’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশের পর বেশ কয়েকজন বন্দীর কাছ থেকে বেরিয়ে আসে আরো ভয়াবহ অভিযোগ।
জানা যায়, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের মামুন অর রশিদ জামিন লাভের পরও সময়মতো মুক্তি পাননি। তার অভিযোগ, নতুন মামলা ও ডিটেনশনের ভয় দেখিয়ে প্রথমে দুই লাখ, পরে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। দীর্ঘ দরকষাকষির পর তার স্বজনদের কাছ থেকে ৭৬ হাজার ৫০০ টাকা নেয়ার পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়। পরে তিনি বিষয়টি লিখিতভাবে কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শকের কাছে অভিযোগ করেন।
মামুন অর রশিদের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর আরো কয়েকজন সাবেক বন্দী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নয়া দিগন্তে এই প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের প্রত্যেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে একই ধরনের অভিযোগ এবং অর্থ আদায়ের প্রায় একই কৌশল ও নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রির সিন্ডিকেট।
আলমডাঙ্গা উপজেলার ডম্বলপুর গ্রামের এরশাদ আলী, ভাংবাড়িয়া গ্রামের সাজিবার রহমান এবং খাসকওড়া গ্রামের বিল্লাল হোসেন অভিযোগ করেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তির দিন ডিএসবি ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা নেয়া হয়।
জীবননগর উপজেলার গোয়ালপাড়া গ্রামের আব্দুল মজিদ সরকার অভিযোগ করেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন কারারক্ষীরা ভেতরে অবৈধ মাদক কারবারও চালান। এই কারবার চালাতে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই গ্রামের তার আপন ভাই আব্দুস সামাদের দাবি, আরিফুল নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেয়া হয়। চুয়াডাঙ্গা শহরের মুক্তিপাড়ার জাকির হোসাইন জ্যাকি অভিযোগ করেন, গত ১২ মার্চ জামিনে মুক্তির দিন তার কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা নেয়া হয়।
কেদারগঞ্জ এলাকার শরিফ হোসেন দুদুর অভিযোগ, ১৭ এপ্রিল জামিনের দিন তাকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। অন্য দিকে সুমুরদিয়া গ্রামের দুরুদ হাসান অভিযোগ করেন, বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারি তার বড় ভাই আবুল হোসেন জামিনে মুক্তি পাওয়ার সময় নগদ দুই হাজার টাকা নেয়া হয়। শুধু তাই নয়, পিসি কার্ডে থাকা এক হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে এক হাজার ২০০ টাকাও ফেরত দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অনেকে জানান, কারাগারের ভেতরে ভালো সিট, চিকিৎসা, স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ কিংবা প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধা পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। কেউ কেউ মুক্তি পাওয়ার পরও ভয়ে মুখ খুলতে চাননি।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কারারক্ষী হেলাল উদ্দীনের নাম। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারের জেল সুপার মির্জা শহিদুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি কারা অধিদফতরের নির্দেশনায় তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও মেহেরপুর জেলা কারাগারের সুপার আমান উল্লাহ বলেন, উভয় পক্ষের বক্তব্য নেয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
একজনের অভিযোগ থেকে শুরু হওয়া এই অনুসন্ধানে এখন একে একে সামনে আসছে বহু মানুষের একই ধরনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলা কোনো সঙ্ঘবদ্ধ অনিয়মের অংশ।
এখন ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, চলমান তদন্তে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সাথে তারা চান, ভবিষ্যতে যেন কোনো বন্দী বা তার পরিবারকে মুক্তির আশায় অবৈধ অর্থের বিনিময়ে হয়রানির শিকার হতে না হয়।



