ব্রিকসে যোগ দিতে ভারতের সাথে যোগাযোগ শুরু হচ্ছে

লক্ষ্য ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা এগিয়ে নেয়া

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে এগিয়ে নিতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বাধীন ১১ জাতির জোট ব্রিকসে যোগ দিতে বাংলাদেশ আগ্রহী। এই জোটে যোগ দেয়ার ক্ষেত্রে চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্রিকসের সদস্য পদের জন্য ভারতের সমর্থন চেয়েছিল বাংলাদেশ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে ব্রিকসের বর্তমান সভাপতিত্বকারী দেশ ভারতের সাথে যোগাযোগ শুরু করতে যাচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ব্রিকসের নির্দিষ্ট কোনো সচিবালয় নেই। জোটটির সভাপতিত্বকারী দেশ সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি ভারত। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হাইকমিশন এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করেনি। তবে জোটটির ব্যাপারে ঢাকার আগ্রহ আছে। এখন দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং উদীয়মান বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করার উপায় হিসেবে বাংলাদেশ ব্রিকসের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ এনডিবির (যা ব্রিকস ব্যাংক নামেও পরিচিত) সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এনডিবি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নে সহায়তা করে। ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাংকটি বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রচারণার কারণে ভারতের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়, যা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ভারত সরকার প্রকাশ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রুটিন কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছিল। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আবারো ব্রিকস নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসে যোগ দেয়ার জন্য ছয়টি নতুন দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশ না থাকলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। ব্রিকসের নতুন সদস্যপদের জন্য আমন্ত্রণ পাওয়া দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া এবং আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই জোটে যোগ দেয়ায় ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা পাঁচ থেকে বেড়ে ৯টি দেশে উন্নীত হয়। সৌদি আরব ব্রিকসের সদস্যপদ গ্রহণে বিলম্ব করে। অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসারে, সৌদি আরব ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই গ্রুপে যোগ দিয়েছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে আরো ১৩টি রাষ্ট্রকে ‘অংশীদার দেশ’ হিসেবে ব্রিকসে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই দেশগুলো হলো আলজেরিয়া, বেলারুশ, বলিভিয়া, কিউবা, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান এবং ভিয়েতনাম। ২০২৫ সালের শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিকসে যোগ দেয়।

সম্মিলিতভাবে ব্রিকস বিশ্ব অর্থনীতির এক চতুর্থাংশের বেশি এবং পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে। ব্রিকস এমন কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে যা বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে সংস্কার করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ব্রিকস কন্টিনজেন্ট রিজার্ভ অ্যারেঞ্জমেন্ট, ব্রিকস পে এবং ব্রিকস জয়েন্ট স্ট্যাটিস্টিক্যাল পাবলিকেশন। ব্রিকস রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের ব্যবহার কমাতে ডি-ডলারাইজেশনকেও এগিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া জোটটি ‘দ্য ইউনিট’ নামে নতুন একটি মুদ্রা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম ১৫ বছরে ব্রিকস প্রায় ৬০টি আন্তঃদেশীয় প্রতিষ্ঠান, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও সংলাপসহ একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেছে।

কিছু বিশ্লেষক ব্রিকসকে উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর বিকল্প এবং বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যরা এটিকে ক্রমবর্ধমান ইউরোপ ও আমেরিকাবিরোধী হিসেবে একটি অসংলগ্ন জোট হিসেবে বর্ণনা করেন। ব্রিকস অসংখ্য বিশ্লেষক এবং বিশ্ব নেতাদের কাছ থেকে প্রশংসা এবং সমালোচনা - দু’টিই পেয়েছে।